সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ণ
সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক নেতাদের ঐতিহাসিক চুক্তি আলোচনা। (ছবি: সংগৃহীত)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভৌগোলিক ও সামরিক উত্তেজনার আবহেই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বহুল প্রতিক্ষীত ও বহুল আলোচিত একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির বরাতে এই বিশ্বজুড়ে তোলপাড় ফেলা তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন ডিসি সফরের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে চলমান দরকষাকষি শেষে চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় (ডিওই) একে একটি ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ (১২৩ চুক্তি) হিসেবে অভিহিত করেছে। এই চুক্তির ফলে সৌদি আরবের উদীয়মান পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শীর্ষ পারমাণবিক ও প্রযুক্তি நிறுவனগুলোর জন্য শত কোটি ডলারের অবকাঠামো নির্মাণের বিশাল বাজার তৈরি হবে।

চুক্তির ধারা বা বিস্তারিত শর্তাবলি এখনো উভয় সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এই রূপরেখা চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে সৌদি আরব তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (Enrichment) আইনি ও প্রযুক্তিগত সুযোগ পেতে পারে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে যেমন ব্যবহারযোগ্য, ঠিক তেমনই চূড়ান্ত মাত্রায় উন্নীত করলে তা পারমাণবিক বোমা তৈরির মৌলিক উপাদান হিসেবেও কাজ করে।

আন্তর্জাতিক সামরিক ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ দল এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত তদারকি প্রোটোকল ছাড়াই এই চুক্তি অনুমোদন পেলে মধ্যপ্রাচ্যের মতো চরম অস্থিতিশীল ও যুদ্ধবিক্ষুব্ধ অঞ্চলে মারাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মূল সহযোগিতা চুক্তির পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথক ‘দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা (সেইফগার্ডস) চুক্তি’ও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, "এই দুটি যুগান্তকারী চুক্তি একসঙ্গে আগামী কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের জন্য বিশ্বস্ত আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের পাশাপাশি দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের বহুবিধ কৌশলগত লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।"

এদিকে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেও ওয়াশিংটনে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। এতে চুক্তিটিকে ‘জ্বালানি খাতে দুই পরাশক্তির বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতারই এক নতুন যুগান্তকারী সম্প্রসারণ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি ও অপ্রত্যক্ষ হামলা-পাল্টা হামলা যখন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে, ঠিক সেই স্পর্শকাতর সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলো। বিশেষ করে মার্কিন মিত্র সৌদি আরবে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ইরানি ড্রোনের আক্রমণের হুমকি তৈরি হয়েছে। তদুপরি, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সৌদি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে জলপথ অবরোধ ও আক্রমণের কঠোর ঘোষণা দেওয়ার ঠিক দুদিনের মাথায় ওয়াশিংটন ও রিয়াদ এই ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির চূড়ান্ত সিলমোহর মারল।

মন্তব্য করুন