রুপালি পর্দার ‘ত্রাতা’ থেকে তামিলনাড়ুর রাজসিংহাসনে: বিজয়ের জাদুকরী উত্থান

রাকিবুল হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৪:০৫ অপরাহ্ণ
রুপালি পর্দার ‘ত্রাতা’ থেকে তামিলনাড়ুর রাজসিংহাসনে: বিজয়ের জাদুকরী উত্থান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তামিল সিনেমার পর্দায় তিনি যখন অশুভ শক্তির বিনাশ করেন, তখন প্রেক্ষাগৃহে হাততালির ঝড় ওঠে। ভক্তরা তাকে ভালোবেসে ডাকেন ‘থালাপথি’ বা সেনাপতি। কিন্তু এবার আর পর্দার কোনো কাল্পনিক ভিলেন নয়, বিজয় জোসেফ সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে। ভারতের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর নবগঠিত দল তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম (TVK) যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তা দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন ভূমিকম্পের জন্ম দিয়েছে।

তামিলনাড়ুর রাজনীতি গত ৫০ বছর ধরে দুটি দ্রাবিড়ীয় দল—ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK)—এর আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে। বিজয়ের উত্থান এই দুই মেরুর রাজনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। নির্বাচনে ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টিতে জয়লাভ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ এখন নতুন কোনো বিকল্প খুঁজছে। ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হলেও ম্যাজিক ফিগার (১১৮) থেকে মাত্র ১০টি আসন দূরে থাকায় বর্তমানে রাজ্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিজয়ের জনপ্রিয়তার ভিত্তি মূলত তাঁর চলচ্চিত্র। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি রোমান্টিক নায়ক থাকলেও গত এক দশকে তাঁর ছবিগুলোর ধরন বদলেছে। ‘মার্শাল’, ‘সারকার’ বা ‘বিগিল’-এর মতো ছবিগুলোতে তিনি সমাজ সংস্কারক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সিনেমার এই ‘ত্রাতা’ বা ‘সেভিয়ার’ ইমেজকেই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ে রূপান্তর করেছেন। পর্দার সেই অদম্য নায়ককেই এখন বাস্তবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে তাঁর কোটি কোটি ভক্ত।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সিনেমা ও ক্ষমতার বিয়ে কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিংবদন্তি এম.জি. রামচন্দ্রন (MGR) এবং জয়ললিতা সেই পথ আগেই দেখিয়ে গেছেন। তবে রজনীকান্ত বা কমল হাসানের মতো সমসাময়িক তারকারা যেখানে রাজনীতিতে এসে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি, সেখানে বিজয় প্রথমবারেই বাজিমাত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের শক্তির জায়গা হলো তাঁর সুশৃঙ্খল ‘ফ্যান ক্লাব’ যা রাতারাতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্যাডারে রূপান্তরিত হয়েছে।

একজন অভিনেতা যখন প্রতি ছবিতে ১০০ কোটি রুপির বেশি পারিশ্রমিক নেন, তখন সব ছেড়ে রাজনীতিতে নামা চাট্টিখানি কথা নয়। বিজয় ঘোষণা করেছেন, তিনি আর সিনেমা করবেন না এবং তাঁর সম্পূর্ণ সময় তামিলনাড়ুর মানুষের জন্য উৎসর্গ করবেন। তাঁর এই ‘ত্যাগের’ ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে তাঁর প্রতি বিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিজয় এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিদার হলেও রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকরের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে। রাজ্যপাল বিজয়কে অবিলম্বে সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দালিলিক প্রমাণ চেয়েছেন। এই বিলম্বকে বিজয়ের সমর্থকরা ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ হিসেবে দেখছেন, যা রাজ্যে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি করছে।

বিজয় জোসেফের এই যাত্রা কেবল একজন অভিনেতার নেতা হওয়ার গল্প নয়; এটি একটি জনপদ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি কি পারবেন এমজিআর-এর মতো সফল মুখ্যমন্ত্রী হতে? নাকি রাজনীতির জটিল প্যাঁচে পড়ে হারাবেন তাঁর জৌলুস? উত্তরটি সময় দেবে। তবে আপাতত ভারতের রাজনীতির মানচিত্রে ‘থালাপথি’ বিজয় একটি উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মন্তব্য করুন