কৃষির রূপান্তর বনাম নির্বাচনী অঙ্গীকার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
ড. মো. মসিউর রহমান: বাংলাদেশের কৃষি এখন আর শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য, মূল্যস্ফীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবেশ এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের জিডিপিতে কৃষির সরাসরি অবদান ১০.৯৪ শতাংশ এবং মোট কর্মশক্তির ৪৬ শতাংশ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কৃষির সংকট মানে শুধু কৃষকের সংকট নয়- এর অভিঘাত পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬ সালে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে কৃষিকে আত্মনির্ভরশীল, জলবায়ু-সহনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্য সামনে এসেছে—কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ ও কৃষক সুরক্ষা, ন্যায্যমূল্য, সরকারি ক্রয়, কৃষি বীমা, পানি নিরাপত্তা, প্রিসিশন এগ্রিকালচার (Precision Agriculture), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, সেন্সর, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন, এগ্রো-এন্টারপ্রেনারশিপ এবং রপ্তানিমুখী কৃষির মতো বিষয়সমূহ।
বাংলাদেশের কৃষি অবশ্যই বড় সাফল্যের গল্প। খাদ্য উৎপাদন, বিশেষ করে ধান উৎপাদনে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৬ সালে বোরো ধানের উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টন হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), যা আগের বছরের রেকর্ডের কাছাকাছি। কিন্তু একই সময়ে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য-ঘাটতির মুখে পড়তে পারে বলে FAO-র সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আপাত বৈপরীত্যই আমাদের কৃষিনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। অর্থাৎ, শুধু উৎপাদন বাড়লেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্যের দাম, পুষ্টিমান, নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং কৃষকের ন্যায্য আয়—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।
ইতোমধ্যে কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রাথমিক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১০টি জেলায় ২২ হাজারের বেশি প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক সূচনা। তবে কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্ডটি কতটা কার্যকরভাবে কৃষকের জন্য সার, বীজ, সেচ, ঋণ, বীমা, বাজার ও সরকারি ক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে তার ওপর।
বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে ফসল কাটার সময় অনেক ক্ষেত্রে বাজারদর কমে যায়, আবার ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার এই মূল্য ব্যবধান কৃষির অন্যতম বড় কাঠামোগত সমস্যা। তাই কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে শুধু সরকারি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদন ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য, সংরক্ষণ সুবিধা, স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্র এবং স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা। কৃষক কার্ডকে তাই শুধু পরিচয়পত্র হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডিজিটাল কৃষক প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। একজন কৃষকের জমির পরিমাণ, ফসল, উৎপাদন, ঋণ, ভর্তুকি, বীমা, বাজারদর ও সরকারি সহায়তার তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় থাকলে কৃষি সহায়তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা থেকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় উত্তরণ। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের কৃষিনীতি মূলত চাল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে সাফল্য অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন ডাল, তেলবীজ, ফল, সবজি, মাছ, দুধ ও ডিমসহ বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ভিশনও ‘টেকসই, নিরাপদ ও লাভজনক কৃষি’; এর মিশনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শস্য বহুমুখীকরণ, পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ ফসল এবং আধুনিক বিপণনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের কৃষি গবেষণায় শুধু অধিক ফলনশীল জাত নয়; খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও তাপসহিষ্ণু জাত, পানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং বহুমুখী কৃষিব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কৃষি বীমাকেও পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে কার্যকর জাতীয় ব্যবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি।
পানি ব্যবস্থাপনাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাল, বিল, জলাধার ও স্থানীয় পানি ব্যবস্থাকে কৃষি অবকাঠামোর অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। বরেন্দ্রসহ পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে পানি-সাশ্রয়ী সেচ ও ফসল বিন্যাস সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপকূল, চর, হাওর, পাহাড় ও জলাবদ্ধ এলাকার জন্য পৃথক কৃষি পরিকল্পনা থাকা উচিত।
প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। AI, ড্রোন, সেন্সর, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার কৃষিতে রোগবালাই শনাক্তকরণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, সার প্রয়োগ, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও কৃষকদের জন্য এমন সেবা ব্যবস্থার প্রস্তাব যথার্থভাবেই এসেছে।
কৃষি গবেষণাকে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। BARI, BRRI, BINA, BJRI, BSRI, BWMRI-সহ জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না; তাদের হতে হবে ভবিষ্যৎ কৃষির জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রধান কেন্দ্র। জলবায়ু-সহনশীল জাত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল, নিরাপদ খাদ্য, যান্ত্রিকীকরণ, জীবপ্রযুক্তি, সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায়। ফল ও সবজি উৎপাদন বাড়িয়ে যদি বিপুল অংশ মাঠেই বা বাজারে নষ্ট হয়, তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সুফল কৃষক পাবেন না।
প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্যের কৃষিপণ্যের জন্য বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন, স্টোরেজ, প্রক্রিয়াকরণ এবং ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি কৃষির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার পূর্বশর্ত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান Research-Extension linkage আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট ও ধরে রাখার জন্য কৃষি গবেষণা পেশাকে আকর্ষণীয়, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা সুবিধা সৃষ্টি, আধুনিক ল্যাবরেটরি, পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়ন, স্বচ্ছ ক্যারিয়ার কাঠামো এবং গবেষণার ফলের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও মানবসম্পদ দুর্বল রেখে আধুনিক কৃষির স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
আশার কথা, গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর দপ্তর-সংস্থাসমূহের সাথে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী কৃষি গবেষণা পেশার মানোন্নয়ন, মেধাবীদের আকৃষ্টকরণ এবং অভিজ্ঞ গবেষকদের ধরে রাখার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের তাগিদ দেন। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিসিএস ক্যাডার ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কৃষি গবেষকদের সুযোগ-সুবিধার একটি তুলনামূলক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়। নির্দেশনা মোতাবেক একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে।
এখানে কৃষি ও উদ্যোক্তার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কৃষককে শুধু কাঁচামাল উৎপাদক হিসেবে না দেখে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সঙ্গে যুবসমাজকে যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে কৃষিজমি রক্ষা। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে আবাদি জমি কমতে থাকলে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা দিয়ে সব ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হবে। তাই কৃষিজমিকে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর Agricultural Land Zoning, কৃষিজমির রেজিস্ট্রি এবং ভূমি ব্যবহারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, কৃষি উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু প্রযুক্তি নয়, প্রকল্প নয়, এমনকি উৎপাদনও নয়—কৃষক। কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, ঝুঁকির সময় সুরক্ষা না পান, সাশ্রয়ী ঋণ ও উপকরণ না পান এবং তাঁর সন্তান যদি কৃষিকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে না দেখে, তবে কোনো কৃষিনীতি দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
বাংলাদেশের কৃষিনীতি তাই এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের খাদ্যে স্বনির্ভরতা, সেচ ও উৎপাদন বৃদ্ধির দর্শন; বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের বাজারমুখিতা ও বেসরকারি অংশগ্রহণ; এবং বর্তমান সরকারের কৃষক কার্ড, কৃষি বীমা, জলবায়ু-সহনশীলতা, প্রযুক্তি ও কৃষি-ব্যবসাকেন্দ্রিক উদ্যোগ—এসবের ইতিবাচক দিকগুলোকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৃষি রূপান্তর কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। সরকারের নীতিতেও এই ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সাফল্যের মাপকাঠি তাই শুধু কত টন ধান বা কত টন খাদ্য উৎপাদিত হলো, তা হওয়া উচিত নয়। দেখতে হবে—কৃষকের আয় কত বাড়ল, উৎপাদন ব্যয় কত কমল, খাদ্য কতটা নিরাপদ ও পুষ্টিকর হলো, কৃষিজমি কতটা রক্ষা পেল, জলবায়ু ঝুঁকি কতটা কমল এবং কৃষিপণ্য কতটা মূল্য সংযোজন ও রপ্তানিতে গেল। কারণ আগামী দিনের ‘আমরা আমাদের চাহিদা মত খাদ্য উৎপাদন করতে পেরেছি’ এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; কৃষক লাভজনকভাবে উৎপাদন করতে পারছে কি না, সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে কি না এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষি টেকসই কি না—এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তরই নির্ধারণ করবে নির্বাচনী কৃষি অঙ্গীকার কতটা বাস্তব সাফল্যে রূপ নিল।
লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর
এআইএল/সকালবেলা