বন্ধুর শোকে ব্যাকুল সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল, দাফন শেষে স্মৃতিচারণ
অনলাইন ডেস্ক: সব সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের রসায়ন একেবারেই ভিন্ন ও অনন্য। মানসিক হতাশা, দুঃখ-কষ্ট আর জীবনযুদ্ধের দুর্দিনে আসল বন্ধুরাই পরম ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ায়। যেসব কথা কাউকে বলা যায় না, তাও অকপটে বলে দেওয়া যায় বন্ধুদের কাছে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে দিন দিন যেন ছোট হয়ে আসছে বন্ধুত্বের পরিসর। এমন বাস্তবতার মাঝে হঠাৎ করে প্রিয় বাল্যবন্ধুকে চিরতরে হারিয়ে যেন দিশেহারা ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিন বন্ধু।
গত সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীতে নিজ বাসায় ঘুমন্ত অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মো. আব্দুল আজিজ সুমন (৪১)। পেশায় ব্যবসায়ী সুমনের অকালপ্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে আসে তাঁর পরিবার ও শৈশবের বন্ধুদের মাঝে। পরদিন মঙ্গলবার (২১ জুলাই) তাকে রাজধানীর ডেমরার কোনাপাড়া এলাকার ধার্মিকপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রিয় বন্ধুকে নিজহাতে কবরে শুইয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর শৈশবের তিন বন্ধু—সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নাজমুল হাসান শিশির, চিকিৎসক মুহাম্মদ হাসনাত এবং ব্যবসায়ী মো. রনি।
আজ বুধবার (২২ জুলাই) সামাজিক মাধ্যমে নিজের হারিয়ে যাওয়া ‘কলিজার টুকরা’ বন্ধুকে নিয়ে অত্যন্ত আকুল ও আবেগঘন এক স্মৃতিচারণ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী নাজমুল হাসান শিশির।
বন্ধুর স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত শিশির লেখেন, ‘চরম কঠিন এবং সত্য হলো এই আমার কলিজার টুকরা বাল্য বন্ধু সুমন আর নেই। আমার বন্ধুরা একে একে যখন এতিম হচ্ছি, তখন সুমনও আমাদের সবাইকে এতিম করে গেল। সে ছিল প্রচণ্ড অভিমানী। কোনোদিন জানতেও দিত না সে কোন বন্ধুর ওপর বিরক্ত বা কষ্ট পেয়েছে। অথচ দিব্যি সেই বন্ধুর সঙ্গেই ঘুরেছে। মুখে হাসি যেন তার আজন্ম স্বভাব। শৈশবে আমরা চার বন্ধু হাসনাত, রনি, সুমন আর আমি যেন একই সুতোয় বাঁধা চারটি প্রাণ।’
সুমনের অসাধারণ বই পড়ার অভ্যাসের কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘সুমন প্রচণ্ড পড়ুয়া ছেলে ছিল। নটরডেম কলেজের লাইব্রেরি থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিদের আগে ইস্যু করা বইগুলো সে খুঁজত। তিন গোয়েন্দা, শরৎচন্দ্র, কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা জীবনানন্দ দাশ—যা-ই বলি না কেন, তার বই পড়ার গভীরতা এত ছিল যে শেষ পর্যন্ত দর্শনের মিশ্রণে তর্কে সে আমাদের হারিয়ে দিত।’
জীবনযুদ্ধের নানান ঘাত-প্রতিঘাতে বন্ধু সুমনের নিঃস্বার্থ সহযোগিতার কথা স্মরণ করে শিশির আরও লেখেন, ‘২০১১ সালে হুট করে যখন ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিলাম, তখন সুমন অস্ট্রেলিয়ায়। আমাকে ফোন করে নাটকীয়ভাবে ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে দিল যাতে সমস্যায় না পড়ি। আবার ভারতে সন্তানের চিকিৎসার সময়ও ফোন করে পাশে দাঁড়িয়েছিল। এমন বন্ধুকে শেষ সময়ে এসে কাজের ব্যস্ততায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারিনি, এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে!’
বন্ধুকে শেষ বিদায় জানানোর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি কখনো কবরে নামিনি সুমন, তোর জন্য নামতে হলো। তুই আমাকে যত কিছু শিখিয়েছিস তার দায় শোধ করতে পারিনি, অথচ দেখ তুই মরে গিয়ে আমাকে কবরে নামাও শিখিয়েছিস। আঙ্কেলের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ, "বাবারে তোরে ক্যামনে রেখে যাই?"—আমাদের ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। তোর তুলা দিয়ে বন্ধ করা নাক দিয়ে জমাট বাঁধা রক্ত দেখে বুকটা ফেটে গেছে দোস্ত।’
আবেগভরা কণ্ঠে নাজমুল হাসান লেখেন, ‘তোকে আমার খুব প্রয়োজন ছিল, একবার জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইতাম। তুই তোর ফ্যান্টাসটিক ফোরটিতেই থাকবি, তোর আর বয়স বাড়বে না। কিন্তু আমি তো খুব অসহায়। তুই তো আমাকে পানির মতো হিগস বোজন থিওরি বুঝিয়েছিলি। আজ অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন ঝুলে আছে, তোকে আমার খুব দরকার। আসবি একবার?’
উল্লেখ্য, অকালপ্রয়াত মো. আব্দুল আজিজ সুমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে অস্ট্রেলিয়া থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি দুই কন্যাসন্তান ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেখে গেছেন।
|