সরকার বা অন্যের খরচে হজ করার বিধান ও সওয়াব লাভ
ইসলামী জীবন ডেস্ক : মুমিন জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও পরম আকাঙ্ক্ষিত ইবাদত হলো পবিত্র হজ। একজন প্রকৃত মুমিন তার সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যয় করে হলেও এই মহান ইবাদত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা মনে পোষণ করেন। তবে শারীরিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই নিজের খরচে হজে যেতে পারেন না। অনেক সময় রাষ্ট্র বা সরকার, সমাজনেতা, ধনাঢ্য প্রিয়জন কিংবা কোনো দাতব্য সংস্থার অর্থায়নে অনেকেরই হজের পবিত্র সফর নসিব হয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে অন্যের অর্থায়নে বা সরকারি খরচে হজে যাওয়া এবং সেই হজের মাধ্যমে পূর্ণ সওয়াব লাভ করা যাবে কি না, তা নিয়ে মুসলিম সমাজে নানা জিজ্ঞাসা রয়েছে। আজ শুক্রবার (২২ মে) বিকাল ৩টা ১৩ মিনিটে প্রকাশিত বিশেষ এক ধর্মীয় নিবন্ধে এই বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়া ও শরিয়তের বিধান ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট আলেম মুফতি ওমর বিন নাছির।
ইসলামী শরিয়তের আলোকে তিনি জানান, সরকারি খরচে কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির অর্থায়নে হজে যাওয়া মূলত তাদের পক্ষ থেকে একটি আন্তরিক হাদিয়া, বিশেষ সহযোগিতা ও সম্মানজনক বিষয়। যদি কোনো ব্যক্তি এমন সুযোগ পাওয়ার পর সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে, একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজের যাবতীয় ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ যথাযথভাবে আদায় করেন, তবে তিনি হজের পূর্ণ সওয়াবই লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ। কেননা ইসলামে হজ কবুল হওয়ার মূল মাপকাঠি হলো— ইখলাস (নিষ্ঠা), তাকওয়া এবং সম্পদের হালাল উপার্জন। নিজের পকেটের টাকা খরচ না হলে সওয়াব কম হবে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
তাই কারো বৈধ আর্থিক সহায়তায় হজে যাওয়াতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো বাধা বা অসুবিধা নেই। বরং এটি মুসলিম সমাজে পারস্পরিক সুন্দর সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। বিখ্যাত ফকিহ আবু লাইস (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, শাসকের পক্ষ থেকে উপহার বা হজের অনুদান গ্রহণ করার বিষয়ে প্রাচীন আলেমদের মধ্যে সামান্য মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মত ইতিবাচক। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন, ‘আমিও এই মত পোষণ করি, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রদত্ত সেই অর্থের মধ্যে কোনো হারাম বিষয় স্পষ্টভাবে জানা না যায়, ততক্ষণ তা গ্রহণ করা জায়েজ।’ (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যা, ৫/৩৯৬)।
এমনকি সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র যুগেও শাসকদের পক্ষ থেকে এমন উপহার বা অনুদান গ্রহণের বহু ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বিভিন্ন মানুষকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে উপহার দিতেন এবং সাহাবিরা তা সানন্দে গ্রহণ করতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ১০৫走৯)।
তবে অন্যের টাকা বা সরকারি খরচে হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় মনে রাখা জরুরি— হজের সম্পূর্ণ সফরটি অবশ্যই শতভাগ হালাল সম্পদ দ্বারা সম্পাদিত হতে হবে। যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি কোনো সুদি কারবার, ঘুষ কিংবা অন্য কোনো হারাম উপার্জনের কালো টাকা দ্বারা কাউকে হজে পাঠাচ্ছেন, তবে সেই অর্থ গ্রহণ করা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ হবে না।
কারণ, হারাম সম্পদ দ্বারা হজ আদায় করলে হজের মূল কবুলিয়ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ বিষয়ে সতর্ক করে স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি উত্তম ও হালাল সম্পদ নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে বের হয় এবং ‘লাব্বাইক’ বলতে বলতে যাত্রা করে, তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক (ফেরেশতা) বলে ওঠেন: তোমার ডাকে সাড়া দেওয়া হয়েছে, তোমার রিজিক হালাল, তোমার বাহন হালাল এবং তোমার হজ মাবরুর (মকবুল) হয়েছে। আর যখন কেউ কোনো হারাম সম্পদ নিয়ে হজের সফরে বের হয় এবং ‘লাব্বাইক’ বলে, তখন আকাশ থেকে ঘোষণা আসে: তোমার ডাকে কোনো সাড়া নেই; তোমার রিজিক হারাম, তোমার ব্যয়কৃত অর্থ হারাম এবং তোমার এই হজ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ (মুজামে আওসাত, হাদিস নং: ৫২২৮)।
অনেকেই মনে করেন, নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় না করলে হয়তো হজের পূর্ণ সওয়াব বা মর্যাদা পাওয়া যাবে না। অথচ ইসলামের অমোঘ বাস্তবতা হলো— যদি উপার্জন হালাল হয়, সহায়তা বা হাদিয়ার প্রক্রিয়াটি বৈধ হয় এবং হজ যদি খাঁটি ইখলাসের সাথে আদায় করা হয়, তবে আল্লাহর অসীম রহমতের দরজা সেই বান্দার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দার ভেতরের আন্তরিকতা ও নিয়ত দেখেন, পকেটের অর্থের পরিমাণ বা মালিকানা নয়।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ফিকহি কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে মুফতি ওমর বিন নাছির আরও উল্লেখ করেন, ‘যদি দাতার বা হজে প্রেরণকারী ব্যক্তির অর্জিত সম্পদের অধিকাংশ বা সিংহভাগ হালাল হয়, তাহলে তার দেওয়া উপহার বা হজের স্পন্সর গ্রহণ করতে কোনো ধর্মীয় বাধা নেই; যতক্ষণ না সুনির্দিষ্টভাবে ও নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে যে, এই টাকাটিই হারাম উৎস থেকে এসেছে।’ (মাজমাউল আনহার: ৪/১৮৬, বাজাজিয়্যা: ৬/৩৬০, কাজি খান: ৩/৪০০)।
অতএব, হাদিয়ার উৎস ও অর্থ বৈধ হওয়া সাপেক্ষে সরকারি কোটায় বা অন্যের ব্যক্তিগত অর্থায়নে হজে যাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে মকবুল হজের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়ার আশা রাখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, হজ শুধু কাবাঘর প্রদক্ষিণ বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মানব আত্মাকে সব ধরণের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করার এক মহান আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ।
জান্নাত সকালাবেলা
|