বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আমাদের এই প্রিয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের শেকড় মূলত কৃষিজীবী মানুষের জীবন ও ফসলের সময়ের সঙ্গে মিশে আছে। নিচে বাংলা সনের জন্ম থেকে বর্তমান রূপ লাভের ইতিহাসটি সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তবে এর গণনা শুরু ধরা হয় তাঁর সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ (৯৬৩ হিজরি) থেকে।
কেন এই পরিবর্তন? তৎকালীন সময়ে খাজনা আদায় করা হতো চান্দ্রবর্ষ বা হিজরি সনের হিসেবে। চান্দ্রবর্ষ প্রতি বছর ১১ দিন এগিয়ে যায়, যা কৃষকের ফসল কাটার সময়ের সাথে মিলত না।
ফসলি সন: কৃষকদের খাজনা দেওয়ার সুবিধার্থে জ্যোর্তিবিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীর প্রচেষ্টায় হিজরি (চান্দ্রবর্ষ) ও সৌরবর্ষের সমন্বয় করে 'ইলাহি সন' বা 'ফসলি সন' চালু হয়। এটিই পরে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায়।
সম্রাট আকবর ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম বঙ্গাব্দ প্রবর্তক হিসেবে আলোচনায় আসে:
রাজা শশাঙ্ক: ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সিংহাসন আরোহণ থেকে এই গণনা শুরু বলে কেউ কেউ মনে করেন।
তিব্বতি রাজা স্রংসন: তাঁর নাম থেকে 'সন' কথাটি এসেছে বলে একটি মত রয়েছে।
সুলতান হোসেন শাহ: তিনি নিজেকে 'বাঙালি' হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন, তাই তাঁর সময়ে এই সনের শুরু বলে অনেকে মনে করেন।
বাংলা মাসগুলোর নাম এসেছে নক্ষত্রের নাম থেকে। প্রাচীন শাকাব্দ (সাকা জাতির সময় প্রচলিত) থেকে এই নামগুলো নেওয়া হয়েছে:
| নক্ষত্র | মাস | নক্ষত্র | মাস |
| বিশাখা | বৈশাখ | কৃতিকা | কার্তিক |
| জাইষ্ঠা | জৈষ্ঠ্য | পুস্যা | পৌষ |
| আষাঢ়া | আষাঢ় | আগ্রৈহনী | অগ্রহায়ণ |
| শ্রাবনা | শ্রাবন | মাঘা | মাঘ |
| ভাদ্রপাদা | ভাদ্র | ফাল্গুনী | ফাল্গুন |
| আশ্বিনী | আশ্বিন | চিত্রা | চৈত্র |
বাংলা সনকে বৈজ্ঞানিক রূপ দিতে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমি যে সংস্কারগুলো আনে:
মাসের দিন বিন্যাস: বৈশাখ থেকে ভাদ্র—প্রথম ৫ মাস হবে ৩১ দিনের। আশ্বিন থেকে চৈত্র—পরের ৭ মাস হবে ৩০ দিনের।
অধিবর্ষ (Leap Year): প্রতি ৪ বছর অন্তর ফাল্গুন মাস হবে ৩১ দিনের।
দিন গণনা: বাংলা সনের দিন শুরু হয় সূর্যোদয়ের সময় থেকে (ইংরেজি সনের মতো রাত ১২টা থেকে নয়)।
হালখাতা: মুঘল আমলে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের বই বা 'হালখাতা' খুলতেন এবং ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন।
সাংস্কৃতিক বিপ্লব: ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা।
আজ পহেলা বৈশাখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এক সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের শেকড় আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে উদযাপন করে।
জান্নাত/সকালবেলা