এআইয়ের যুগে সন্তান লালন-পালন: সুযোগ নাকি নতুন বিপদ?

রাকিবুল হাসান
প্রকাশ: বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৫:২৮ অপরাহ্ণ
এআইয়ের যুগে সন্তান লালন-পালন: সুযোগ নাকি নতুন বিপদ?

ফিচার ডেস্ক: চ্যাটবট থেকে শুরু করে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংবা শিক্ষামূলক অ্যাপ—জীবনের সব ক্ষেত্রে এখন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) রাজত্ব। এই আধুনিক প্রযুক্তি শিশুদের সামনে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, এর আড়ালে নিয়ে আসছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও গভীর মানসিক ঝুঁকি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইং জুর মতে, সন্তান খুব ছোট থাকা অবস্থাতেই মা-বাবার উচিত তার সাথে এআই নিয়ে আলাপ শুরু করা। কারণ শিশুরা নিজেরা সরাসরি এআই ব্যবহার না করলেও ঘর, স্কুল বা বন্ধুদের মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে এর সংস্পর্শে আসছে। অর্থাৎ, বর্তমানের কোনো শিশুই আর এআইয়ের আওতার বাইরে নয়।

স্মার্ট স্পিকার বা রোবট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কীভাবে মানুষের নির্দেশ মেনে চলে, কিন্তু তারা মানুষের মতো ‘চিন্তা’ বা ‘অনুভব’ করতে পারে না—এই সহজ উদাহরণগুলোর মাধ্যমে শিশুদের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বোঝানো জরুরি। কারণ একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক পরিবেশ এবং দৈনন্দিন রুটিন প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে এআই শিশুদের জন্য একজন ব্যক্তিগত ২৪ ঘণ্টার শিক্ষকের মতো ভূমিকা রাখতে পারে। যেকোনো জটিল বিষয়কে এটি খুব সহজে ভেঙে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং কুইজ বা অনুশীলনে দারুণ সহায়তা করে। তবে মুদ্রার ওপিঠ বলছে ভিন্ন কথা। অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা শিশুদের নিজস্ব ও স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন তাদের স্কুলের সব কাজ বা অধিকাংশ অ্যাসাইনমেন্ট এআইয়ের সাহায্য নিয়ে স্রেফ কপি-পেস্ট করছে, যা তাদের দায়বদ্ধতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টার এবং কমনসেন্স মিডিয়ার যৌথ গবেষণায় একটি চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, অধিকাংশ অভিভাবকই জানেন না তাঁদের সন্তান অনলাইনে এআই দিয়ে আসলে কী করছে। যেখানে ৬৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত চ্যাটবট ব্যবহার করছে, সেখানে মাত্র ৫১ শতাংশ অভিভাবক এই বিষয়ে অবগত। এমনকি ১০ জনের মধ্যে ৪ জন অভিভাবক কখনো সন্তানের সাথে এআইয়ের ভালো-মন্দ নিয়ে কথাই বলেননি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এআইয়ের কাছ থেকে শিশুদের ‘আবেগীয় সমর্থন’ বা ‘ইমোশনাল সাপোর্ট’ নেওয়া। গবেষণার তথ্য বলছে, ১২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী জীবনের নানা পরামর্শ বা মানসিক একাকীত্ব দূর করতে মানুষের চেয়ে এআই চ্যাটবটকে বেশি পছন্দ করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এআই মূলত সব সময় ব্যবহারকারীর সাথে সুর মিলিয়ে কথা বলার বা তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়। ফলে শিশুরা যদি রক্ত-মাংসের মানুষের বদলে এআইয়ের সাথে বেশি সময় কাটায়, তবে তারা বাস্তব সম্পর্কের জটিলতা, মতভেদ কিংবা আপস করার মতো অত্যন্ত জরুরি সামাজিক দক্ষতাগুলো শিখতে ব্যর্থ হবে। এমনকি চ্যাটবটের সাথে এই অতিরিক্ত অলীক আসক্তির ফলে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার মতো চরম ঘটনাও ঘটেছে।

আপনার সন্তান এআই বা চ্যাটবটের প্রতি বিপজ্জনকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে কি না, তা বুঝতে অভিভাবকদের কিছু লক্ষণ খেয়াল করতে হবে:

  • তারা এআই-কে নিজের সেরা বন্ধু (Best Friend) বা একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী মনে করলে।

  • কোনো কারণে ইন্টারনেট বা এআই ব্যবহার করতে না পারলে চরম অস্থির হয়ে পড়লে।

  • স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে থাকলে, রাত জেগে ব্যবহারের কারণে ঘুম কমে গেলে বা বাস্তব বন্ধুদের এড়িয়ে চললে।

  • পরিবারের সাথে কোনো কঠিন বা জটিল আলোচনা এড়াতে এআইয়ের কৃত্রিম উত্তরের সাহায্য নিলে।

যেহেতু এআই প্রযুক্তিটি সবার জন্যই নতুন, তাই একতরফা একনায়ক বা বিশেষজ্ঞ না হয়ে সন্তানের সাথে বন্ধু সেজে নতুন প্রযুক্তিটি বোঝার চেষ্টা করুন। ১. ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা: নিজের নাম, স্কুলের ঠিকানা বা ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি কেন এআইয়ের সাথে শেয়ার করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা সন্তানকে খোলামেলা বুঝিয়ে বলুন। ২. শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ: স্কুলগুলো পড়াশোনায় কীভাবে এআই ব্যবহার করছে বা এর নৈতিক দিকগুলো কীভাবে সামলাচ্ছে, তা নিয়ে নিয়মিত শিক্ষকদের সাথে আলাপ করুন। ৩. ডিজিটাল বাউন্ডারি: এআই বা স্ক্রিন ব্যবহারের দৈনিক সময়সীমা এবং এর ব্যবহারের ধরন নিয়ে পরিবারের সবাই মিলে একটি সুন্দর ‘পারিবারিক নিয়ম’ বা সীমানা নির্ধারণ করুন।

মন্তব্য করুন