বিশেষ সংবাদদাতাঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)-এর ভূমি ও ইমারত শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে ছয়টি নির্মাণ কাজে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, এসব নির্মাণ কাজে কার্যাদেশ দেওয়ার আগে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাক এবং তার অন্যতম সহযোগী মোঃ মেহেদী হাসান। তিনি মূলত উপসহকারী প্রকৌশলী হলেও সম্প্রতি সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) অতিরিক্ত দায়িত্বে অনৈতিকভাবে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মোঃ মেহেদী হাসান ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লেনদেনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে তার নিয়োগ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, মোঃ মেহেদী হাসানের সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা উপসহকারী প্রকৌশলী (রেফ্রিজারেশন এন্ড এয়ারকন্ডিশন), অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভেঙে তাকে উপসহকারী প্রকৌশলী (যন্ত্রকৌশল) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারা কারা জড়িত—তা নিয়েও নিবিড় অনুসন্ধান চলছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কোথায়, এবং এসব আর্থিক অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে? সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ বিষয়ে একটি স্বাধীন, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
একই ধারাবাহিকতায় যশোর ও পাবনার ঈশ্বরদী কার্যালয়ের ড্রেনেজ নির্মাণ কাজেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা “ডন এন্টারপ্রাইজ”-কে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়, যা সরকারি ক্রয়নীতির পরিপন্থী বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ১৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কিছু নির্মাণ কাজে কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নিম্নমানের কাজ ও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে—যা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার বড় ধরনের লঙ্ঘন।
ঠিকাদারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন স্থানে বৈঠক করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট ও উত্তরার নর্থ টাওয়ারে এমন বৈঠকের কথা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা সরকারি আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বেআইনিভাবে ২৫ শতাংশ নিরাপত্তা জামানত নির্ধারণ করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৬ লাখ টাকা বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আইনি সহায়তা নিয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বিভিন্ন অনিয়ম, প্রতারণা ও মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বৃহৎ প্রকল্প PARTNER-এর আওতায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি যেখানে ৬০-৭০ শতাংশ, সেখানে বিএআরআই’র অগ্রগতি মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ। এই ধীরগতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মহাপরিচালককে বিব্রত করতে নির্মাণ কাজের ত্রুটির তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রাজ্জাক দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে দরপত্র মূল্যায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও NOA প্রদানের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ থাকায় চলমান দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাকে দ্রুত এই কমিটির সদস্য সচিব পদ থেকে অব্যাহতি না দিলে অনিয়মের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাকে অবিলম্বে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মোঃ আবদুর রাজ্জাক ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল এই পদে যোগদান করেন এবং আগামী ২০২৬ সালের ৪ জুন তার অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত না করে অবসরকালীন সুবিধা প্রদান করা হলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, ছয়টি নির্মাণ কাজে NOA প্রদানের আর্থিক অনিয়মসহ সকল অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবসরকালীন সুবিধা স্থগিত রাখার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।