পুরুষ হতে গিয়ে স্তন অপারেশন: ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে যুবতীর মৃত্যু
সাঈদ পান্থ, বরিশাল: নারী থেকে পুরুষে রূপান্তরের স্বপ্ন নিয়ে প্রথম ধাপের স্তন (মাস্টেকটমি) অপারেশন করানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামের এক যুবতীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর পান্থপথ গ্রীন রোডের ‘ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে’ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদারের (রব রাজ) মেয়ে।
রবিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা থেকে মরদেহ গৌরনদীর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় ও গুঞ্জন সৃষ্টি হয়। পরে কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সন্ধ্যার মধ্যেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিজা পারিবারিকভাবে নারী হলেও শৈশব থেকেই ছেলেদের মতো পোশাক পরতেন, চুল ছোট রাখতেন এবং পুরুষের মতো আচরণ করতেন। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামের এক তরুণীর সাথে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। জেনিফাকে লিজা নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিতেন এবং জেনিফাও লিজাকে স্বামী সম্বোধন করে দেখাশোনা করতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, উভয়ের মাঝে সমকামিতার সম্পর্ক ছিল। এর আগেও লিজা নিজের ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে প্রকাশ পায়।
এ বিষয়ে জেনিফা আক্তার জানান, লিজা বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকায় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরিবার থেকে লিজার মা-বাবা ও বোন অপারেশনের জন্য দেড় লাখ টাকা জোগান দেন। সেই অর্থ নিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ইউনিহেলথ হাসপাতালে লিজাকে ‘সরফরাজ’ নাম দিয়ে ভর্তি করানো হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পূর্বে সম্মতিপত্রে লিজার বৈধ ‘স্ত্রী’ হিসেবে জেনিফা নিজেই স্বাক্ষর করেন। আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সই করার কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, লিজার মা-বাবার সম্মতিতেই তিনি স্বাক্ষর করেছেন।
তবে লিজার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জেনিফা নামের ওই মেয়ে যে হাসপাতালে আমার মেয়ের স্ত্রী সেজে সই করবে এবং আমার মেয়েকে ‘সরফরাজ’ নামে ভর্তি করা হয়েছে—এসবের কিছুই আমি জানতাম না। আজ মৃত্যুর পরই কেবল এসব শুনতে পারছি। পরিবারের কোনো বিষয়েই আমার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না।”
মৃতের মা ফজিলা বেগম বলেন, “লিজা ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মনমানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে। তাকে অতীতে দুবার বিয়ে দেওয়া হলেও সে কোনো সংসার করেনি। পরে সে জেনিফার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। অপারেশনের পুরো দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
এদিকে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের ছাড়পত্র ও মৃত্যু সনদে দেখা যায়, লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ হিসেবে ‘পুরুষ’ উল্লেখ করা হয়েছে। জেন্ডার রূপান্তর সংক্রান্ত সংবেদনশীল অস্ত্রোপচারের প্রশাসনিক ও আইনি অনুমতি ওই হাসপাতালের রয়েছে কি না—তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে মৃত্যু সনদে দেওয়া হাসপাতালের টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে জেনারেল ম্যানেজার (জিএম)-এর সাথে কথা বলার অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিৎ বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ওপর দায়িত্ব চাপান।
পরবর্তীতে রোগীটির দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘অত্যন্ত ব্যস্ত’ দাবি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
কোনো বৈধ আইনি প্রক্রিয়া এবং উপযুক্ত জেন্ডার ডিসফোরিয়া বা মানসিক ও শারীরিক বোর্ড মূল্যায়ন ছাড়াই ছদ্মনামে এমন জটিল ও সংবেদনশীল রূপান্তর অস্ত্রোপচার কীভাবে সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরো বিষয়টি নিবিড় তদন্ত করে দায়ী হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।