নওগাঁর মান্দায় সেনা সদস্য স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
নওগাঁর মান্দায় সেনা সদস্য স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
মাহবুবুজ্জামান সেতু,স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ: নওগাঁর মান্দা উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে অমানুষিক নির্যাতন, শিকল দিয়ে বেঁধে অবরুদ্ধ করে মারধর এবং পরবর্তীতে প্রতারণামূলকভাবে তালাক দেওয়ার অভিযোগ তুলে এক কর্মরত সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ওনার ভুক্তভোগী স্ত্রী। একই সঙ্গে ওনার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে ওনাকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন বলেও ওনার অভিযোগ।
এই নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে আজ রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে উপজেলার গণেশপুর ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ মোছা. দিলরুবা আক্তার (২২)।
অভিযুক্ত স্বামীর নাম মো. মাহবুল হাসান সুমন। তিনি মান্দা উপজেলার মধ্য মৈনম গ্রামের মো. চয়ন আলী শাহের ছেলে। তিনি বর্তমানে খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের ১৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সৈনিক (নম্বর-৪০৬৩৪৪৫) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দিলরুবা আক্তার জানান, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সুমনের সঙ্গে ওনার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ওনার দরিদ্র বাবা সুমনের পরিবারকে নগদ এক লাখ টাকা, প্রায় ৪০ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্বর্ণের আংটি এবং প্রায় এক লাখ টাকার বিভিন্ন আসবাবপত্র উপহার হিসেবে প্রদান করেন। তবে সুমনের চাকরিজনিত কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতার অজুহাতে সে সময় ওনাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক আইনি নিবন্ধন (কাবিননামা) করা হয়নি।
দিলরুবার অভিযোগ, বিয়ের পর কিছু দিন ভালো কাটলেও পরবর্তীতে স্বামী ও ওনার পরিবারের সদস্যরা অতিরিক্ত পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে ওনার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। নিরুপায় হয়ে দিলরুবা সাভার সেনানিবাসে স্বামীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে সেনা কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে ও মধ্যস্থতায় চলতি বছরের ১৩ মার্চ দুই লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে ওনাদের বিয়ের আইনি নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
দিলরুবা আক্তার আরও বলেন, "নিবন্ধনের পর সুমনের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। গত বছরের ১৪ আগস্ট রাতে স্বামীর বাড়িতে ওনাকে নির্মমভাবে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে জখম করা হয়। খবর পেয়ে আমার বাবা ওনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে নিরুপায় হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে মান্দা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওনাকে শিকলবন্দী অবস্থা থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।"
নৃশংস এই শিকল নির্যাতনের ঘটনায় দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মান্দা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলে মূল অভিযুক্ত সেনা সদস্য সুমন পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। পরে পুনরায় সুখে সংসার করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও আপস-মীমাংসার শর্তে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান সুমন।
ভুক্তভোগী দিলরুবা বলেন, "গত ২৯ এপ্রিল আদালতের মধ্যস্থতায় ও আমাকে সুমনের বাড়িতে পাঠানো হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর সুমন ও ওনার পরিবারের সদস্যরা আমার ওপর পুনরায় শারীরিক নির্যাতন চালান এবং একপর্যায়ে আমাকে জোর করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এরই মধ্যে আমার স্বামী সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সর্বশেষ গত ২ জুন কাজী অফিসের মাধ্যমে আমাকে একটি একতরফা তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।"
সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ও আবেগাপ্লুত হয়ে দিলরুবা আক্তার বলেন, “আমি আমার ভাঙা সংসারটি টিকিয়ে রাখতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওনারা আমাকে পশুর মতো নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি একজন সেনা সদস্যের এমন অনৈতিক ও পাশবিক আচরণের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।” তিনি জানান, ন্যায়বিচারের আশায় বিষয়টি নিয়ে তিনি খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের মান্যবর অধিনায়কের কাছেও একটি লিখিত ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন।
আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী দিলরুবার পাশে ওনার বাবা দেলোয়ার হোসেন, মা নার্গিস বেগম, দাদা আজিজার রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে এই নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানান। তবে সংবাদ সম্মেলনে আনীত গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত সেনা সদস্য মো. মাহবুল হাসান সুমনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ওনার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
|