১১ দিন পর মণিরামপুরে ফিরল চার লাশ
আব্দুল্লাহ আল মামুন (মণিরামপুর, যশোর): কক্সবাজারের ইনানীতে ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো যশোরের মণিরামপুরের একই পরিবারের চার সদস্যের লাশ দীর্ঘ ১১ দিন পর নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশগুলো উপজেলার মোহনপুর গ্রামের বাড়িতে আনা হলে প্রিয়জনদের শেষবারের মতো একনজর দেখতে স্বজন ও এলাকাবাসী ভিড় জমান। চারজনের একসঙ্গে এই ফিরে আসার খবরে কান্না ও শোকের ভারে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।
নিহতরা হলেন—মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা তানজি (৩৬) এবং দুই কন্যাসন্তান রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় মসজিদ থেকে চারটি খাটিয়া প্রস্তুত করা হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি খোঁড়া হয় চারটি কবর। দুপুরে গোসল শেষে বিকেল ৩টায় স্থানীয় বাঁধাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা সম্পন্ন হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই পরিবারের চার সদস্যকে।
একই পরিবারের চারজনকে একসঙ্গে হারিয়ে শোকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা। আগুনে পুড়ে যাওয়া প্রিয়জনদের লাশের অবশিষ্টাংশ দেখে নির্বাক হয়ে পড়েন তাঁরা। বিশেষ করে সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে রয়েছেন নিহত তুহিনের বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান।
তুহিনের মামা খাইরুল আলম জানান, দশ বছর আগে তুহিনের মা মারা গেছেন। তাঁর বড় ভাই প্রিন্স সিলেটে চাকরি করেন এবং তুহিন পরিবার নিয়ে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করতেন। গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান একাই বসবাস করতেন।
তিনি আরও বলেন, "মেধাবী চাকরিজীবী ছোট ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনির লাশ দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়েন মতিয়ার রহমান। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি প্রায় কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। বেশির ভাগ সময় চুপচাপ থাকছেন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করায় তাঁর ডায়াবেটিসও মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।"
তুহিনের চাচাতো ভাই খালিদ হোসেন জানান, রিসোর্টের ভয়াবহ আগুনে পুড়ে তুহিন, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের লাশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে খালি চোখে তাঁদের শনাক্ত করা অসম্ভব ছিল। পরিচয় নিশ্চিত করতে গত ১৯ অক্টোবর ঢাকায় গিয়ে ডিএনএর নমুনা দেন তুহিনের বাবা মতিয়ার রহমান। দীর্ঘ আট দিন পর সোমবার নমুনার প্রতিবেদন হাতে আসার পর মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে লাশগুলো বুঝে নেন স্বজনেরা।
নিহত নাহিদুর রহমান তুহিন ঢাকার শ্যামলীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘গ্রান্ড পাওয়ার লিমিটেড’-এ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৭ অক্টোবর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক ভ্রমণে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। পরদিন শনিবার সকালে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা যান পুরো পরিবারটি।
সমুদ্র দেখার অপার আনন্দ আর উৎসবের আমেজ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া পরিবারটির আর জীবিত ফেরা হলো না। দীর্ঘ ১১ দিন পর অবশেষে চারটি লাশ ফিরল গ্রামের বাড়িতে—আর পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তুহিন, তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যা। তাঁদের এই করুণ ও আকস্মিক প্রস্থানে পুরো মণিরামপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এআইএল/সকালবেলা