নিজস্ব প্রতিবেদক: মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিনের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী ২৪ মে (রোববার)। সাবেক এই দূরদর্শী রাজনীতিক ও খ্যাতিমান পার্লামেন্টারিয়ানের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ব্যারিস্টার সালেহউদ্দিন একাধারে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ), স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য (এমসিএ) এবং প্রথম জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৩৭ সালের ২ জুলাই গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানীতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন এই কীর্তিমান পুরুষ। অবিভক্ত ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে রাজবন্দী হিসেবে কারাবরণ করতে হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বরিশালে যে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল, তাতে অংশ নেওয়ার সময় তৎকালীন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
তিনি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী বিএম ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫৬ সালে আইএ এবং ১৯৫৯ সালে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং লন্ডনের বিখ্যাত ইনার টেম্পল থেকে ১৯৬৮ সালে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। তিনি কিছুকাল ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবেও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি বরিশাল টাউন ইয়ুথ লীগের সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি “পাক ইয়ুথ ফেডারেশন” গঠন করেন। ১৯৬৮ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন পাকিস্তান হাইকমিশন ভবন দখলের ঐতিহাসিক ঘটনার নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাঙালির অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলেন।
একই বছরে তিনি “The Rights of East Pakistan Defence Front” গঠন করে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। তাঁরই বিশেষ উদ্যোগে ও একক প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ এমপি ও কুইন্স কাউন্সিলর স্যার টমাস উইলিয়ামকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধান আইনি পরামর্শক হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ফরিদপুর-২ আসন থেকে তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ২৬ মার্চ তাঁর সরাসরি নেতৃত্বে ফরিদপুরে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর আগে ১৮ মার্চ বোয়ালমারী ডাকবাংলোর সামনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন যুদ্ধক্যাম্প তত্ত্বাবধান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের মূল সংবিধান প্রণয়নে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সংবিধানে স্বাক্ষর করেন।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ (বর্তমান ফরিদপুর-১) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ন্যাপে (NAP) যোগ দেন এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি স্বীয় রাজনৈতিক দর্শনে ‘বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, নির্ভীক, প্রচারবিমুখ এবং সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন খাঁটি জননেতা।
১৯৮৩ সালের ২৪ মে তৎকালীন ঢাকার পিজি (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে বনানী কবরস্থানে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। তাঁর গৌরবময় স্মৃতি রক্ষার্থে ইতিমধ্যেই “ব্যারিস্টার সৈয়দ কামরুল ইসলাম মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন টেকনিক্যাল কলেজ” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “ব্যারিস্টার সালেহউদ্দিন: জীবন ও রাজনীতি” নামক একটি স্মারক গ্রন্থ।
বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আগামীকাল মরহুমের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণসভা, কালো ব্যাজ ধারণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।
এআইএল/সকালবেলা