থানায় নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০১:৫৮ অপরাহ্ণ
থানায় নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার

হাবিবুর রহমান হাবিব, (রংপুর): রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ভেতরে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগ উঠেছে থানার ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। 

গতকাল বুধবার (৩ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কোতোয়ালি থানার ভেতরে এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের মুখে তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করার পাশাপাশি একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রক্তাক্ত ও মারধরের শিকার ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের রংপুর সদর উপজেলা শাখার সদস্য সচিব।

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরীর সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। ওই যুগলকে উদ্ধারের পর বুধবার সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানায় আনা হয়। যুগলের পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি মীমাংসা করতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। লাভলু নামে এক নেতার ডাকে সেখানে যান রাকিবুল ইসলাম রাকিবও।

অভিযোগ রয়েছে, থানায় গিয়ে রাকিব দেখতে পান এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে বেধড়ক মারধর করছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁর ওপর চড়াও হন এবং বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন।

ঘটনার খবর পেয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় গেটের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম। তখন তাঁর শরীরে রক্তের দাগ এবং আঘাতে একটি চোখ মারাত্মকভাবে ফুলে থাকতে দেখা যায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাকিব বলেন, "এখানে ওসি এবং এসআই আমাকে রাইফেল দিয়ে মারলো। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, পরিচয় দিয়েছি যে আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব, বিএনপির একজন কর্মী। আমার নামে ১৩টা মামলা, আমি ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার। তারপরেও তারা আমাকে মেরে চোখটা নষ্ট করে দিল, মাথায় দুই জায়গায় বন্দুক দিয়ে মারছে। আমার দুটি ফোন কেড়ে নিছে। পুলিশের চরিত্র এখনো ফ্যাসিবাদীর মতো রয়েছে। আমি এর বিচার চাই।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, মারধরের পর পুলিশ সদস্যরা জোর করে তাঁর শরীরের রক্ত ধুয়ে দেয়। পরে রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু থানায় এসে আহত নেতাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া প্রেমিক যুগলের দুই পরিবারের মধ্যে হাতাহাতি হলে পুলিশ তা থামায়। তবে আহত নেতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও কাপড়ে রক্তের দাগ প্রসঙ্গে ওসির কাছে জানতে চাইলে তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করে বলেন, "অনেক সময় আম ছিলতে গিয়েও তো রক্ত বের হয়।"

এদিকে রংপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জাকারিয়া ইসলাম জিম এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওসিসহ দোষী পুলিশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে থানা ঘেরাওসহ তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর, দিবাগত রাত ২টা ২২ মিনিটে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়।

ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে তিন পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তাঁরা হলেন— নারী কনস্টেবল লিমা সরেন, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা এবং সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মাসুদ রানা।

একইসঙ্গে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে সভাপতি, ডিসি (ক্রাইম) মো. মাহফুজুর রহমান এবং এসি (কোতোয়ালি) সুকুমার রায়কে সদস্য করে ৩ সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত শেষ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন