চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি স্থগিত
একই সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, দ্রুত উদ্ধার অভিযান ও সুষম ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকি করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) চালু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই সব তথ্য নিশ্চিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাই বর্তমান প্রশাসনের সর্বোচ্চ ও মূল অগ্রাধিকার। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি মানুষের মূল্যবান জীবন। কোনো নাগরিকের প্রাণ যেন সামান্যতম অসচেতনতা বা অবহেলার কারণেও ঝরে না পড়ে, সেটি আমরা নিশ্চিত করব। আমি পাহাড়ে ও নিচু এলাকায় আটকে থাকা সবাইকে বিনীত অনুরোধ করব, আপনারা কোনো দ্বিধা না রেখে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসুন।”
তিনি আরও জানান, চট্টগ্রামের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ও প্রতি ঘণ্টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে (পিএমও) সরাসরি অবহিত করা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টার হালনাগাদ তথ্য নেওয়া হচ্ছে এবং উদ্ধারকাজে গতি আনতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ত্রাণ তৎপরতার খতিয়ান তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে জেলার জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ লাখ টাকা জরুরি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান পাওয়া গেছে। প্রথম দফার এই সরকারি বরাদ্দ ইতিমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন উপজেলায় বণ্টন করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) চাহিদার ভিত্তিতে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিতরণ করা হবে, যাতে কোনো দুর্গত মানুষ এক বেলার জন্যও খাদ্যসংকটে না পড়েন।”
বন্যাদুর্গত এলাকার উদ্ধার কার্যক্রম আরও বেগবান করতে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ১০টি অত্যাধুনিক স্পিডবোট প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, “স্পিডবোটের চাহিদা জানিয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। স্পিডবোটগুলো পাওয়া গেলে তীব্র স্রোতের কারণে পানিবন্দি থাকা প্রত্যন্ত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা অনেক বেশি কার্যকর হবে। আপাতত স্থানীয় নৌকার মাধ্যমে আমাদের উদ্ধার অভিযান পুরোদমে চালানো হচ্ছে।”
তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কাজের সুবিধার্থে জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ইপসা (YPSA), আনসার বাহিনী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) যুক্ত করে পৃথক পৃথক বিশেষ রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলো যেকোনো দুর্গত বা অবরুদ্ধ এলাকায় খবর পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত পৌঁছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে প্রাণহানি ঠেকাতে জেলা প্রশাসক নিজে সশরীরে মাঠে থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, “লালখান বাজার, পোড়া পাহাড় ও ১ নম্বর ঝিলসহ বিভিন্ন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা আমরা পরিদর্শন করেছি। সেখানে চরম ঝুঁকিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জোর আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার এবং রান্না করা গরম খাবার বিতরণ করা হয়েছে।”
বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা জুড়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত মোট ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে অবস্থান নেওয়া মানুষদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং শিশুদের পুষ্টির কথা চিন্তা করে মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওআরস্যালাইন ও ৫ লিটার করে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেওয়া গর্ভবতী নারী, দুগ্ধজাত শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বিশেষ ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবার (মেডিকেল টিম) ব্যবস্থাও সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চট্টগ্রামের অতি বন্যাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় ইতিমধ্যে প্রায় আট হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে আসা কোনো মানুষ যেন কোনো অবস্থাতেই অভুক্ত না থাকেন এবং প্রয়োজনীয় সকল সরকারি ও মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সামগ্রিক দূরদর্শিতা ও প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “প্রতিটি উপজেলায় পৃথক পৃথক লোকাল কন্ট্রোল রুম এবং জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় মেইন কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সব ধরনের ছুটি বাতিল করে মানুষের জানমালের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠপর্যায়ে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
সবশেষে জেলা প্রশাসক বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলা করা শুধু সরকারের একার একক দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের একটি সম্মিলিত মানবিক দায়িত্ব। আমি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিত্তবান ও তরুণদের প্রতি দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আকুল আহ্বান জানাচ্ছি। একটি মানবিক ও সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন আমাদের সবার সময়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব।”
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল ও প্লাবিত জনপদের বাসিন্দাদের প্রতি শেষবারের মতো হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসুন, অন্যথায় প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে জোরপূর্বক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না।”
|