গরুর মাংস কতটুকু খাওয়া নিরাপদ? পুষ্টিবিদদের পরামর্শ
লাইফস্টাইল ডেস্ক : আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষের মনেই একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, গরুর মাংস বা লাল মাংস (Red Meat) খেলেই স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে রক্তে কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপের ভয়ে অনেকেই সাধের এই খাবারটি চিরতরে এড়িয়ে চলেন। তবে আধুনিক পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গরুর মাংসকে ঢালাওভাবে ক্ষতিকর ভাবা পুরোপুরি ভুল। সঠিক পরিমাণ ও স্বাস্থ্যসম্মত নিয়ম মেনে রান্না করে খেলে গরুর মাংস শরীরের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর ও উপকারী খাদ্য হতে পারে। আজ রবিবার (৩১ মে) সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে প্রকাশিত এক বিশেষ লাইফস্টাইল প্রতিবেদনে গরুর মাংসের পুষ্টিগুণ, নিরাপদ খাওয়ার পরিমাণ এবং চর্বি কমানোর নানাবিধ বৈজ্ঞানিক উপায় তুলে ধরা হয়েছে।
পুষ্টিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, গরুর মাংসে উচ্চমানের প্রোটিন ছাড়াও রয়েছে জিংক, আয়রন, ফসফরাস ও সেলেনিয়ামের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। পাশাপাশি এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬ এবং ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়, যা মানবদেহের পেশি, হাড়, দাঁত, ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। এছাড়া শরীরের তাৎক্ষণিক শক্তি উৎপাদন, ক্ষতের দ্রুত নিরাময়, দৃষ্টিশক্তির উন্নয়ন এবং রক্তস্বল্পতা (Anemia) প্রতিরোধেও এই উপাদানগুলো দারুণ সহায়ক।
পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, একজন মানুষের দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা মূলত নির্ভর করে তার শরীরের মোট ওজন এবং বর্তমান শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণভাবে, ৫০ কেজি ওজনের একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক প্রায় ৫০ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। তবে কিডনি বা বৃক্কজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিনের চাহিদা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। অন্যদিকে, গর্ভবতী নারী বা নারীদের মাসিকের সময় প্রোটিনের চাহিদা সাধারণের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করা মোটেও উচিত নয়। সাধারণত দিনে ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন গ্রহণ করলে শরীরে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম চর্বিহীন গরুর মাংসে প্রায় ২৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন ও অল্প পরিমাণ ফ্যাট থাকে। তবে দৈনিক প্রোটিনের এই চাহিদা শুধু এককভাবে মাংস থেকে পূরণ না করে ডাল, ডিম বা মাছের মতো বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ মানুষের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই দিন সীমিত পরিমাণে গরুর মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। ওই দুই দিনে সব মিলিয়ে মোট তিন থেকে পাঁচ বেলা (Meals) মাংস খাওয়া যেতে পারে, যার মোট ওজন হবে সর্বোচ্চ ১৫৪ গ্রাম। অর্থাৎ প্রতি বেলায় ১৬ থেকে ২৬ গ্রাম বা ছোট সাইজের ২ থেকে ৩ টুকরোর বেশি মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী রোগীরা চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই মাংস খাবেন না।
ক্যালরি হিসাব অনুযায়ী, ২৫ গ্রাম চর্বিহীন গরুর মাংস থেকে মাত্র ৬২ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়, যা দৈনিক চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। তাই গরুর মাংসকে উচ্চ ক্যালরির খাবার ভাবা যুক্তিসঙ্গত নয়। আবার অনেকেই মনে করেন গরুর মাংসে কোলেস্টেরল সবচেয়ে বেশি। অথচ পুষ্টিবিদদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র একটি মুরগির ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরলের পরিমাণ প্রায় ১৯০ মিলিগ্রাম, যা প্রায় ২১০ গ্রাম চর্বিহীন গরুর মাংসে থাকা কোলেস্টেরলের সমান। ফলে গরুর মাংসকেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার বলা পুরোপুরি ভুল।
গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে এর কাটিং ও প্রস্তুত প্রণালির ওপর। গরুর শরীরের তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত অংশ— যেমন ‘রাউন্ড’ ও ‘স্যারলয়েন’ খাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। রান্নার আগে মাংসের গায়ে লেগে থাকা অতিরিক্ত দৃশ্যমান চর্বি ছুড়ি দিয়ে কেটে ফেলে দিলে কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেকটাই কমে যায়।
এছাড়া বিশেষজ্ঞরা জানান, মাংস বড় টুকরো না করে ছোট ছোট টুকরো করে কাটলে চর্বির পরিমাণ কমে। মাংস কিমা বা মিহি কুচি করে নিলেও ফ্যাট কম পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো— মাংস রান্নার আগে ভালো করে সেদ্ধ করে নিয়ে জলের উপরে জমানো চর্বির স্তরটি চামচ দিয়ে ফেলে দেওয়া। রান্নার সময় সয়াবিন তেলের ব্যবহার সর্বনিম্ন রাখা এবং মাংস নরম করতে লেবুর রস, ভিনেগার বা টক দই ব্যবহার করলে তা ফ্যাট বা চর্বি গলাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত কড়া ভাজা (যেমন মাংসের কালা ভুনা) বা তেলের ওপর ভাসতে থাকা ঘন ঝোল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এর বদলে ওভেনে গ্রিল, শিক কাবাব বা কম তেলে স্টু করে রান্না করলে তা শরীরের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর হয়।
সবচেয়ে ভালো হয় গরুর মাংসের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে রান্নার সময় মাংসের হাঁড়িতে বিভিন্ন উপকারী সবজি যেমন লাউ, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা পেঁপে যুক্ত করা। এটি খাবারের আঁশ বা ফাইবারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সবশেষে পুষ্টিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত গরুর মাংস গ্রহণ করলে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস এবং স্থূলতা বা মোটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বহুল অংশে বেড়ে যায়। এমনকি কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণায় অতিরিক্ত লাল মাংস গ্রহণকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। তাই গরুর মাংসকে জীবন থেকে পুরোপুরি নির্বাসিত না করে, পরিমিত পরিমাণে ও সঠিক বৈজ্ঞানিক নিয়মে খাওয়াই সুস্থ থাকার একমাত্র নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি।
জান্নাত সকালবেলা
|