ধূমপান যেভাবে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে

প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৪:৩০ অপরাহ্ণ
ধূমপান যেভাবে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে

লাইফস্টাইল ডেস্ক : আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর ধূমপানের নানাবিধ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে যখনই কোনো আলোচনা বা কথা ওঠে, তখনই সবার প্রথমে আমাদের মনের কোণে ভেসে ওঠে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতির কথা। ধূমপানের কারণে ফুসফুস ক্যানসার বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগ হতে পারে— এই বিষয়টি সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষেরই বেশ ভালো জানা। কিন্তু আমাদের শরীরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হৃদযন্ত্রের (Heart) ওপর ধূমপানের সরাসরি এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই তেমন কোনো স্পষ্ট ধারণা রাখেন না বা জানেন না। প্রতিদিনের এই আপাত সাধারণ ধূমপানের অভ্যাস কীভাবে অলক্ষ্যে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ক্ষতিগ্রস্ত করে হার্ট অ্যাটাকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা জানা এখন সময়ের দাবি।

আজ রবিবার (৩১ মে) সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল’ বিভাগের এক বিশেষ স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রতিবেদনে ধূমপান ও হৃদরোগের পারস্পরিক বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।


চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, নিয়মিত ধূমপানের ফলে মানবদেহে উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তনালীতে দুর্বল ও ধীরগতির রক্ত সঞ্চালনের মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। এটি মূলত রক্তনালীর ওপর তামাকের প্রধান উপাদান ‘নিকোটিন’-এর সরাসরি বিষাক্ত প্রভাবের কারণে ঘটে থাকে। নিকোটিন শরীরে প্রবেশের সাথে সাথে স্বাভাবিক রক্তনালীগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে সংকুচিত বা সরু করে ফেলে, যা তাৎক্ষণিকভাবে শরীরের রক্তচাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এটি মানবদেহের প্রধান ধমনীগুলোর ভেতরের সূক্ষ্ম আস্তরণ বা দেয়ালকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ধমনীতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া বা ‘এথেরোস্ক্লেরোসিস’ (Atherosclerosis) অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়ার দরুণ রক্তপ্রবাহ চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং নালীর ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার (Blood Clotting) প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীতে স্ট্রোকের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


অনেকে মনে করেন নিজে ধূমপান না করলে হয়তো হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে বেঁচে থাকা যায়। তবে চিকিৎসকেরা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছেন। যারা নিজেরা সরাসরি ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীদের আশেপাশে থাকেন, সেই ‘পরোক্ষ ধূমপান’ (Second-hand Smoking)-এর শিকার ব্যক্তিরাও সমানভাবে হৃদরোগের ঝুঁকিতে পড়েন। নিয়মিত তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসার কারণে একজন অধূমপায়ীর শরীরেও উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হতে পারে এবং করোনারি ধমনী ও অন্যান্য উপ-রক্তনালীতে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে। এই নিয়মিত ধোঁয়ার সংস্পর্শ, বিশেষ করে কোমলমতি শিশু এবং বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের মতো সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে খুব দ্রুত হৃদরোগের জন্ম দেয়। ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ কার্ডিওলজি (European Society of Cardiology)-এর সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য অনুসারে, পরোক্ষ ধূমপানের নিয়মিত শিকার হলে মানুষের স্বাভাবিক হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন অনিয়মিত (Arrhythmia) হয়ে যেতে পারে, যা আকস্মিক হার্ট ফেলিয়রের ঝুঁকি বাড়ায়।


অনেকে বিড়ি-সিগারেটের বিকল্প হিসেবে জর্দা, গুল বা সাদা পাতার মতো ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে ভাবেন তাঁরা নিরাপদ আছেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, ধোঁয়াবিহীন তামাক বা সুগন্ধি জর্দাতেও প্রচুর পরিমাণে নিকোটিন থাকে এবং এটি শরীরের ভেতরে গিয়ে ঠিক একই ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই ক্ষেত্রে ধোঁয়া না থাকায় ফুসফুস হয়তো সাময়িকভাবে ক্যানসারের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে; কিন্তু ভেতরের নিকোটিন সরাসরি রক্তে মিশে রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করে। ফলশ্রুতিতে কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগের ঝুঁকি জর্দা সেবনের কারণেও সমানভাবে বৃদ্ধি পায়।


ধূমপানের অভ্যাস মানুষের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখে। তবে আশার আলো এই যে, কোনো ব্যক্তি যদি আজই ধূমপান পুরোপুরি ত্যাগ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন, তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার (এক দিন) মধ্যেই তাঁর শরীরের বর্ধিত হৃদস্পন্দন এবং উচ্চ রক্তচাপ কমতে শুরু করে স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে। চিকিৎসকদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করলে হার্ট অ্যাটাক, মারাত্মক ব্রেইন স্ট্রোক এবং ভাস্কুলার ডিজিজ (হাত-পা ও কিডনির ধমনীতে রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়া)-এর মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একজন চেইন স্মোকারের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের এই দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি ধূমপান ছাড়ার পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে একজন সাধারণ অধূমপায়ীর সুস্থ ও স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। তাই সুস্থ হৃদযন্ত্রের জন্য অবিলম্বে তামাক বর্জনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন