ট্রাম্পের নতুন শুল্কের পাল্টা জবাব: জোসেফ ই স্টিগলিৎস
লেখা: জোসেফ ই স্টিগলিৎস
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছটফটানি আবারও শুরু হয়েছে। তিনি ইচ্ছেমতো কখনো শুল্ক বাড়াচ্ছেন, আবার কখনো কমাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বাক্ষর করা আন্তর্জাতিক চুক্তি তো ভাঙছেনই, সম্ভবত মার্কিন ফেডারেল আইনও লঙ্ঘন করছেন। আগেরবারের সঙ্গে এবারের পার্থক্য একটাই—শুল্ক আরোপের জন্য তিনি এবার ‘জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ করা’র এক নতুন অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসনের এই উদ্বেগ আসলে এক বড় ছলনা। ট্রাম্প আগে বাণিজ্যঘাটতির দোহাই দিয়ে যেসব শুল্ক বসিয়েছিলেন, এই নতুন শুল্কগুলোও ঠিক একই প্রকৃতির। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আগের শুল্কগুলো বাতিল করার পর প্রশাসন ১৫০ দিনের যে অস্থায়ী শুল্ক চাপিয়েছিল, তার মেয়াদ জুলাইয়ের শেষে ফুরিয়ে যায়। এখন শ্রম নির্যাতন ঠেকানোর তথাকথিত তদন্তের অশুভ দোহাই দিয়ে নতুন শুল্ক আনা হলো।
আশ্চর্যের বিষয়, ‘জোরপূর্বক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্যের বড় উৎস হিসেবে পরিচিত চীনকে এ যাত্রায় প্রায় ছাড়ই দেওয়া হয়েছে। কারণ, বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চীন পাল্টা লড়াই করার ক্ষমতা দেখাতেই ট্রাম্প সুর নরম করে পিছু হটলেন। ট্রাম্প মূলত সেখানেই আগ্রাসী হন, যেখানে অন্য দেশ বা প্রতিষ্ঠান তাঁর ভয়ে নতি স্বীকার করে।
যদি ট্রাম্প সত্যিই জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে চিন্তিত হতেন, তবে তিনি নিজের দেশেই নজর দিতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এখনো বিপুল সংখ্যক কারাবন্দীকে দিয়ে বাধ্যতামূলক শ্রম দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সে দেশের লাখ লাখ বন্দী সরাসরি উৎপাদন খাতে যুক্ত। ট্রাম্পের যুক্তি যদি সততার ওপর দাঁড়ানো হতো, তবে মার্কিন যেসব অঙ্গরাজ্যে বন্দী-শ্রম ব্যবস্থার অপব্যবহার হয়, সেগুলোর পণ্যের ওপরও আন্তর্জাতিক শুল্ক পড়া উচিত ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আরও বেশি যুক্তিহীন। কারণ ইইউ ইতোমধ্যে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য নিষিদ্ধ করেছে। তবে ট্রাম্পের এই অন্যায্য চাপের মুখে ইউরোপ নীতিগতভাবে লড়াই করার বদলে কেবল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে—যা অত্যন্ত হতাশাজনক। ইউরোপের উচিত ছিল আমেরিকার ভণ্ডামি প্রকাশ্যে তুলে ধরে মার্কিন বন্দী-শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা।
অন্যদিক, কানাডার ওপর শুল্ক বসাতে ট্রাম্প ১৯৩০ সালের পুরোনো ‘স্মুট-হাওলি’ আইনের আশ্রয় নিয়েছেন, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বৈষম্যহীন নীতির পরিষ্কার লঙ্ঘন। ট্রাম্পের এসব ভুল পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন খাত পুনরুজ্জীবিত হয়নি; বরং শত শত চাকরি হারিয়েছে এবং দেশটির বাণিজ্যঘাটতি রেকর্ড ১.২৪ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
ট্রাম্প অন্য যেকোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতোই—তিনি ভয় ছড়িয়ে রাজত্ব করতে চান। কিন্তু বিশ্ববাসী যত দিন তাঁকে সেই সুযোগ দেবে, বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি ততই বাড়তে থাকবে। ট্রাম্পের এই অন্যায্য শুল্কনীতির সামনে নতি স্বীকার না করে শক্ত ভাষায় পাল্টা জবাব দেওয়াটাই এখন সময়ের দাবি।
(লেখক: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।)
|