দিল্লিতে আন্দোলন দমনে সাদা পোশাকধারী লাঠিধারীদের ভিডিও ছড়িয়ে তুমুল বিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে আয়োজিত শিক্ষার্থীদের ‘সংসদ অভিযান’ কর্মসূচির বেশ কয়েকটি বিস্ফোরক ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, দিল্লি পুলিশের ব্যবহৃত অফিশিয়াল মানসম্মত স্ট্যান্ডার্ড-ইস্যু লাঠি হাতে একাধিক ব্যক্তি অবস্থান করছেন, যাদের পরনে পুলিশের কোনো ইউনিফর্ম বা নির্দিষ্ট পোশাকি পরিচয় ছিল না। সম্পূর্ণ সাধারণ বা সাদা পোশাকে এসব অজ্ঞাত ব্যক্তির উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়ে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখন সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন।
জনপ্রিয় রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন 'কাকরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) তাদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) মঙ্গলবার (২১ জুলাই) একটি পোস্টের মাধ্যমে এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানায়। তারা সরাসরি দিল্লি পুলিশকে ট্যাগ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখে, "দিল্লি পুলিশ, সাধারণ পোশাকে লাঠি হাতে এরা কারা? আমাদের ওপর হামলা চালানোর জন্য আপনারা কাদের এই বাহিনীতে ভাড়া করেছেন? আধুনিক ভারতে এ ধরনের দানবীয় চরিত্রদের কেন পুলিশ বলা হচ্ছে?"
এর আগে ভারতের বর্তমান জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম এবং বহুল আলোচিত 'নিট' (NEET) পরীক্ষার ভয়াবহ প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে সিজেপির আহ্বানে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করেন এবং যন্তর মন্তরের কাছে সমবেত হন। আন্দোলনকারীদের রুখতে পুলিশ অত্যন্ত নির্দয়ভাবে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের এই বর্বরোচিত হামলায় বহু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে, তবে তাঁদের মোট আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
ভিডিওর চাঞ্চল্যকর তথ্য ও সাংবাদিকদের প্রশ্ন সিজেপি কর্তৃক শেয়ার করা ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ পোশাক পরা এক ব্যক্তি আরও কয়েকজন লাঠিধারীর সঙ্গে রাস্তার একপাশে বসে আছেন। যখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ওই ব্যক্তি ও তার সঙ্গীদের আসল পরিচয় জানতে চেয়ে প্রশ্ন তোলেন, ঠিক তখনই সেখানে কয়েকজন ইউনিফর্ম পরা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য দ্রুত এসে ছাত্রদের ধমক দেন। এর পরপরই পুলিশ এবং ওই সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা একজোট হয়ে প্রশ্ন তোলা আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন এবং তাঁদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন।
এসব লাঠিধারী অজ্ঞাত ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও ভারতের অনেক প্রখ্যাত সাংবাদিকও প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক রবীশ কুমার এক্স-এ পোস্ট করে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, "লাঠি হাতে তেড়ে আসা এরা কারা? একটা সময় ছিল যখন ক্রাইম রিপোর্টাররা পুলিশের আগেই খবরের তথ্য পেয়ে যেতেন। এখন মনে হচ্ছে তারাও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাকড়সার জালে আটকা পড়েছেন। এর আগে জেএনইউ-এর (জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়) সাবরমতী হোস্টেলেও এভাবে হঠাৎ বহিরাগত গুন্ডারা ঢুকে পড়েছিল। সেই মামলার কী হলো? কেউ কি কোনো শাস্তি পেয়েছে?"
একইভাবে জনপ্রিয় ইউটিউবার ও স্বাধীন সাংবাদিক সমদিশ ভাটিয়াসহ অনেকেই সাধারণ পোশাকে থাকা ওই ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে তাদের এই অদ্ভুত পোশাক ও রহস্যজনক ভূমিকার কারণ জানতে চেয়ে প্রশ্ন তোলেন। এছাড়া সিজেপির প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে আন্দোলনকারীরা বিস্ফোরক অভিযোগ করে জানান, পুলিশের সদস্যরা নিজেদের হাত দিয়েই বিভিন্ন বাস ও রাস্তার সাধারণ গাড়ির কাচ ভাঙচুর করছিলেন যাতে আন্দোলনকারীদের ওপর দায় চাপানো যায়।
দ্বিতীয় দিনেও রণক্ষেত্র দিল্লি, রাজপথে আরএএফ এদিকে, 'সংসদ চলো' অভিযানকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের জাতীয় রাজনীতি। সোমবার পুলিশের মুহুর্মুহু টিয়ারগ্যাস ও বেধড়ক লাঠিচার্জের তাণ্ডবের পর মঙ্গলবার সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তার বলয় ভেদ করে আবারও যন্তর মন্তরে জড়ো হতে শুরু করেছেন হাজার হাজার উদ্যমী আন্দোলনকারী। আজ সকালে হালকা বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ও শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে পুনরায় মূল সমাবেশ ও সরকারবিরোধী স্লোগান শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় কেন্দ্রীয় র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) মোতায়েন করা হয়েছে এবং সংসদ ভবনের অভিমুখে অতিরিক্ত ব্যারাকেড ও টিয়ারগ্যাস ছোঁড়ার বিশেষ গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গতকাল দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো এই বর্বরোচিত পুলিশি হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ভারতে। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেলে হায়দরাবাদে জোড়া বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে একাধিক সাধারণ ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ধর্না নিট পরীক্ষা কেলেঙ্কারি ও সার্বিক শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর এই দমনপীড়নের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। সোমবারের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মঙ্গলবার এই ঘটনার চরম আঁচ পৌঁছে গেছে সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন পর্যন্ত।
আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের বাইরে মূল রাস্তায় অবস্থান বিক্ষোভে বসে পড়েন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরা। রাজপথে আন্দোলনরত নিরীহ শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরার প্রতিবাদে ও দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দ্রুত পদত্যাগের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অনড় হয়ে বসে পড়েন তাঁরা।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশের এই হিংসাত্মক ভূমিকা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও প্রশ্ন তুলে কড়া আন্তর্জাতিক বার্তা দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' (এইচআরডাব্লিউ)।
|