ঈদ-কোরবানিতেও আর ঢোল বাজে না, ওঠে না লাঠির ঝংকার
কালক্রমে খেলার সেই মেঠো মাঠগুলো আজও ঠিক আগের জায়গাতেই সগৌরবে রয়ে গেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে প্রতি বছর উৎসবের ঈদও নিয়ম করেই ফিরে আসে। মানুষও বছরের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে নাড়ির টানে গ্রামে ফেরে। কিন্তু উৎসবের সেই চেনা উন্মাদনা, সেই যৌথ আনন্দ আজ যেন প্রগতির চোরাবালিতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। গ্রামের সবুজ বুক চিরে এখন আর আগের মতো উদাত্ত কণ্ঠে শোনা যায় না ঢোলের গুরুগুরু বোলে লাঠির ছন্দময় ঝনঝন শব্দ। আবহমান বাংলার লোক-সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ লাঠি খেলা আজ ঈদ-কোরবানিকে কেন্দ্র করেও আর গ্রামীণ জনপদে জমে ওঠে না। যে খেলা একসময় গ্রামীণ সমাজ ও বিনোদনের মূল প্রাণভোমরা ছিল, তা আজ আধুনিক নাগরিক জীবনের আগ্রাসনে কেবলই স্মৃতির অ্যালবামে এক ধূসর জলছাপ।
আজ রবিবার (৩১ মে) দুপুর ১টা ১৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ফিচার’ বিভাগের এক বিশেষ ও আবেগঘন প্রতিবেদনে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতির সোনালী অতীত, বর্তমান সংকট এবং এর হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণগুলো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
একসময় গ্রামীণ জনপদে ঈদুল আজহার ছুটি মানেই ছিল লাঠি খেলার এক জমজমাট ও উৎসবমুখর আয়োজন। শহর থেকে ফেরা মানুষ, দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় আর ঢোলের জাদুকরী তালে মুখরিত থাকত পুরো খেলার মাঠ। তবে কালের বিবর্তনে সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিনোদন ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার চরম অভাবে বাংলার শতবর্ষী এই লোকঐতিহ্য আজ তীব্র অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত।
বাস্তবিক অর্থে, লাঠি খেলা কেবলই এক টুকরো বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘মার্শাল আর্ট’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন রূপ। ইতিহাসের দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এই বিশেষ খেলাটি গ্রামীণ সমাজে আত্মরক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দলগত শৃঙ্খলার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাধারণত সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা খাঁটি বাঁশের তৈরি লাঠি হাতে নিয়ে দক্ষ খেলোয়াড়রা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার বিভিন্ন নান্দনিক কৌশল প্রদর্শন করতেন। ঢোল, করতাল ও কাঁসরের দ্রুত তালে তালে যখন একদল অভিজ্ঞ লাঠিয়াল রঙিন পোশাকে মাঠে নেমে পড়তেন, তখন তা শুধু সাধারণ খেলা থাকত না, যেন এক জীবন্ত লোকনাট্যে রূপ নিত।
বিশেষ করে কোরবানি কিংবা রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে লাঠি খেলা হয়ে উঠত গ্রামীণ জনপদের সবচেয়ে বড় সামাজিক মিলনমেলা। এই খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠের পাশে বসত হরেক রকমের অস্থায়ী দোকান, চলত গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা, প্রীতি বিনিময়, হাসি আর গল্পের আসর। অনেক প্রবীণ লাঠিয়াল এখনও স্মৃতিচারণ করে আবেগের সঙ্গে বলেন, একসময় লাঠি খেলার দিনক্ষণ বিশেষভাবে নির্ধারণ করা হতো ঈদের ছুটিকে ঘিরে। কারণ তখন গ্রামের বাইরে থাকা কর্মজীবী মানুষজন বাড়ি ফিরতেন। মাঠে বিপুল দর্শক থাকত, করতালি আর করতালির গর্জন থাকত, আর লাঠিয়ালদের বুকেও থাকত নিজেকে বীর হিসেবে প্রমাণ করার এক অদম্য ও সাহসী আগ্রহ।
সময়ের চাকার সাথে সাথে আমূল বদলে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, বদলে গেছে উৎসব উদযাপনের চিরচেনা ধরনও। একসময় গ্রামীণ জনপদে বাড়ি ফেরা মানেই ছিল প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া, বিকেলে মাঠে যাওয়া, সামাজিক যৌথ আয়োজনে অংশ নেওয়া। কিন্তু বর্তমান যুগে অনেকের কাছেই ঈদের ছুটি মানে স্রেফ ঘরের কোণে বিশ্রাম, একান্ত ব্যক্তিগত সময় কাটানো কিংবা চার দেওয়ালের মাঝে ডিজিটাল বিনোদনের কৃত্রিম জগতে ডুবে থাকা।
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের তীব্র বিস্তারে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ফলে মাঠভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজনের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। একজন প্রবীণ লাঠিয়ালের ভাষায়, “আগে ঈদের পর বিকেল হইলেই গ্রামের পোলাপান লাঠি আর ঢোল নিয়া আনন্দের চোটে মাঠে দৌড়াইত। আর এখনকার পোলাপান সবাই মোবাইল স্ক্রিনের ভেতর গেম আর ফেসবুক নিয়া ব্যস্ত। মাঠে কোনো দর্শক নাই, তাই আমাদের খেলাও আর আগের মতো জমে ওঠে না।”
সাংস্কৃতিক গবেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট খেলার সংকট নয়; এটি মূলত গ্রামীণ সামাজিক জীবনের পরিবর্তনেরও এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। কারণ লাঠি খেলা ছিল বাঙালির যূথবদ্ধ ও দলগত জীবনের এক জীবন্ত দলিল, যেখানে মানুষ সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হতো আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য।
লাঠি খেলার বর্তমান মহাক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মের চরম অনাগ্রহ। যে খেলায় অংশ নেওয়া একসময় গ্রামীণ তরুণদের জন্য ছিল অত্যন্ত গর্ব, শৌর্য ও সাহসিকতার প্রতীক, সেখানে এখন নতুন কোনো মুখ খুব একটা দেখা যায় না। পুরোনো ও প্রবীণ ওস্তাদ খেলোয়াড়রা বয়সের ভারে কিংবা অসুস্থতায় ধীরে ধীরে মাঠ থেকে সরে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের সেই শূন্য জায়গা নেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রশিক্ষিত তরুণ উত্তরসূরি তৈরি হচ্ছে না। নিয়মিত চর্চার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো একাডেমি বা প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতি তরুণদের এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে লাঠি খেলার বহু পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দল আজ বিলুপ্তির পথে।
পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র খরা। একসময় গ্রামীণ স্থানীয় জমিদার, জোতদার বা সমাজের প্রভাবশালী সমাজসেবীরা লাঠিয়াল দলগুলোর সমস্ত খরচ বহন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উৎসবের সময় খেলোয়াড়দের রঙিন পোশাক, বাদ্যযন্ত্র মেরামত এবং যাতায়াতের সমস্ত ব্যয় সানন্দে দেওয়া হতো। বর্তমানে সেই উদার মানসিকতা ও পৃষ্ঠপোষকতা সমাজ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। অর্থসংকটের কারণে অনেক দল টিকে থাকতে না পেরে ভেঙে গেছে এবং জীবিকার নিষ্ঠুর তাগিদে অনেক বংশানুক্রমিক লাঠিয়াল তাঁদের বাপ-দাদার পেশা বদলে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
লাঠি খেলার এই চরম অবক্ষয় শুধু একটি লোকজ খেলার হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি অসাম্প্রদায়িক সামাজিক মেলবন্ধনের মঞ্চও। একটি লাঠি খেলার আসর মানে ছিল পুরো গ্রামের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক হওয়া। আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে সেই সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
তবে এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। দেশের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও কিছু নিবেদিতপ্রাণ লাঠিয়াল দল এবং লোক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বুকের রক্ত জল করে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লোকসংস্কৃতিপ্রেমী গবেষকদের বিশ্বাস— সরকারি ও বেসরকারি জোরালো পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকঐতিহ্যভিত্তিক কারিকুলাম চালু এবং স্থানীয় প্রতিটি মেলা ও উৎসবে নিয়মিত লাঠি খেলার আয়োজন বাধ্যতামূলক করা গেলে, এই প্রাচীন শিল্প আবারও নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠতে পারে। তাহলেই হয়তো কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে আবারও গ্রামীণ জনপদের মাঠ কেঁপে উঠবে ঢোলের চিরচেনা জাদুকরী বোলে এবং লাঠির ছন্দময় বীরত্বপূর্ণ ঝংকারে।
জান্নাত সকালবেলা
|