ইশ্, মা যদি দেখতেন
ফিচার ডেস্ক: মায়ের যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, আহমেদ সাজিদান জারজিস তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজে বসেই পড়াশোনা করতেন এবং এর মাঝেই ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজে (ইউডব্লিউসি) ভর্তির জন্য ডাক পান। অসুস্থ শরীর নিয়েও ছেলের সঙ্গে গিয়েছিলেন মা শিরিন এ চৌধুরী। সেদিন স্কলারশিপের জটিলতায় মা বলেছিলেন, ‘আজ হোক বা কাল, আমার ছেলে বড় কিছু করবেই।’ মায়ের সেই বিশ্বাস আজ শতভাগ সত্যি প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু তা দেখার জন্য মা কিংবা তাঁর ছোট বোন আজ আর কেউ বেঁচে নেই।
গত ২ মে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগো বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬’-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছেন জারজিস। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন ২৫ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগে গত এপ্রিলে ‘ওলি কাপ’ নামের আরেকটি প্রতিযোগিতা থেকেও তিনি সাড়ে ৭ হাজার ডলার অর্জন করেন।
২০২২ সালে কলকাতায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় জারজিস তাঁর বোন সাজমিলা এবং এর ৪০ দিন পর মাকে হারান। প্রিয়জনদের হারানোর এই গভীর শোককেই তিনি রূপান্তর করেছেন শক্তিতে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা শিকার মানুষের জন্য তিনি তৈরি করেছেন সাশ্রয়ী মূল্যের কৃত্রিম অঙ্গভিত্তিক ‘চলাচল সহায়ক ব্যবস্থা’, যার নাম ‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট ওলাফ কলেজে চতুর্থ বর্ষে অধ্যায়নরত জারজিস একই সাথে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের গবেষণা ও পরিশ্রমে তৈরি তাঁর এই উদ্ভাবনের বিশেষত্ব হলো
পশ্চিমা দেশ থেকে আমদানি করা কৃত্রিম অঙ্গের খরচ ৫-২০ লাখ টাকা হলেও এটি তার চেয়ে ৮০ শতাংশ কম খরচে তৈরি সম্ভব। আমদানি করা কৃত্রিম অঙ্গ দেশের আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘাম শোষণ করতে পারে না বলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, তবে ‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’ এই সমস্যার কার্যকর সমাধান। সাধারণ কৃত্রিম অঙ্গ এককালীন হলেও এটি শরীরের বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনযোগ্য, ফলে বারবার নতুন অঙ্গ কিনতে হবে না।
মা ও বোনের মৃত্যুর পর জারজিস তাঁর ছোটবেলার ‘ড্রিম ফাউন্ডেশন’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘শিরিন সাজমিলা ফাউন্ডেশন’। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত একটি এনজিও। সংগঠনটি বাংলাদেশ, ভারত, মিসর, সুদান, কঙ্গো এবং গাজা উপত্যকায় স্বাস্থ্যসেবা, শরণার্থী পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করেছে। এমনকি বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায়ও এই ফাউন্ডেশন অবদান রেখেছে।
চট্টগ্রামের এই তরুণ এখন নিজ জন্মভূমিতে একটি বিশ্বমানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করতে চান। পড়াশোনার পাশাপাশি খাবার সরবরাহের (ডেলিভারি) কাজ করে জমানো টাকা এবং প্রতিযোগিতার পুরস্কারের অর্থ দিয়ে ইতিমধ্যে থ্রিডি প্রিন্টারসহ গবেষণার সরঞ্জাম কেনার কাজ শুরু করেছেন তিনি। জারজিসের স্বপ্ন, বাংলাদেশ একদিন দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রযুক্তির মূল কেন্দ্র (হাব) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
জান্নাত/সকালবেলা
|