ইসমাঈল আযহার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:২৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার জেলজীবন

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার জেলজীবন

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শাসনামলে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মোট পাঁচবার গ্রেফতার ও কারাবরণ করতে হয়েছে— যা বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিরোধী আন্দোলন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকার প্রতিফলন।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগদানের পর খালেদা জিয়া স্বৈরশাসক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন। এই সময়ে তিনি আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনবার গ্রেফতার হন— ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর।

তবে এসব কারাবাস তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি ছিল, এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাকে দীর্ঘমেয়াদি সাজা ভোগ করতে হয়নি।

২০০৭ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আটক

২০০৬ সালে তার সরকারের মেয়াদ শেষে দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয় নির্বাচন স্থগিত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সময়ে খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মইনুল হক রোডের বাসভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর তার জামিন আবেদন নাকচ করা হয় এবং তাকে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সে স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে পাঠানো হয়।

আটক অবস্থায় খালেদা জিয়া ২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর ঈদুল ফিতর এবং একই বছরের ২১ ডিসেম্বর ঈদুল আজহা কারাগারেই পালন করেন। উভয় ঈদে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এবং কাপড়, খাবার ও ফুল দিতে পেরেছিলেন। সেই সময় তার দুই ছেলে— তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো—এছাড়াও কারাবন্দি ছিলেন।

২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি দিনাজপুরে তাঁর মায়ের মৃত্যু হলে, পরদিন ছয় ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাকে জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

মোট ৩৭২ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কারাবাস

২০১৮ সালে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খালেদা জিয়াকে আবার কারাবরণ করতে হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

স্বাস্থ্যগত অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনি কার্যত দুই বছরেরও বেশি সময় বন্দি অবস্থায় ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার শর্তসাপেক্ষে তার সাজা স্থগিত করে, যাতে তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে এটি পূর্ণ মুক্তি ছিল না; তিনি কার্যত গৃহবন্দির মতো আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিলেন।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এলে, রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে তার সাজা লঘু করেন। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া খালাস পান।

বিএনপির নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

খালেদা জিয়া প্রায় টানা ৪১ বছর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন এবং পরের বছর মার্চে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারপারসন হন।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে, ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং একই বছরের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন হন।

পরবর্তীতে তিনি বিএনপির চতুর্থ কাউন্সিল (১৯৯৩), পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল (২০০৯) এবং দশম কাউন্সিল (২০১৬)-এ পুনর্নির্বাচিত হন। দলের নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়াকে বারবার রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৮৩ সালে তিনি সাতদলীয় জোট গঠন করেন এবং ওই বছরের শেষ দিকে সমন্বিত সামরিকবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলন বিভিন্ন পর্যায়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে এবং পরে ১৯৮৭ সাল থেকে “এরশাদ হটাও” নামে একদফা দাবিতে তীব্রতর হয়। রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে, যা শেষ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের পতনে ভূমিকা রাখে এবং সংসদীয় নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে।

দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

বারবার কারাবাস ও রাজনৈতিক সংগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে তার উত্তরাধিকারের একটি সংজ্ঞায়িত অধ্যায় হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যায় বেরিয়ে আসছে যেসব তথ্য

1

ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার : প্রধা

2

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে: মার্কিন কূটনীত

3

মুমিনুল ভেবেছিলেন আজ মুশফিকের রিটায়ারমেন্ট

4

হাদি-খালেদা জিয়াসহ যাদের বিজয় উৎসর্গ করলেন জকসুর ভিপি

5

মামুনুল হককে হেফাজতের সকল পদ থেকে অব্যাহতির দাবি মিথ্যা

6

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনের

7

গুমের মামলা: শেখ হাসিনাসহ ১২ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরুর নির

8

আলোর মুখ দেখছে না প্রধান উপদেষ্টার ‘মার্চিং অর্ডার’ বাস্তবায়

9

শহীদ মীর মুগ্ধের জমজ ভাই মীর স্নিগ্ধকে বগুড়ার শিবগঞ্জে আবেগ

10

ত্রিভুজ প্রেমের ভয়ংকর পরিণতি: শেষে ২৬ খণ্ড হয়ে ড্রামে

11

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতিসংঘের শোক

12

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বুধবার সাধারণ ছুটি, ৩ দিনের রাষ্ট্রীয

13

ন্যায়ভিত্তিক খুলনা নিশ্চিতের আহ্বানে অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অ

14

এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন দুই ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ ও মাহফুজ

15

সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পির নির্দেশে হা‌দি হত‌্যাকাণ্ড: ডিবি

16

অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানের পদত্যাগ, বিএনপি থেকে নির্বা

17

সুনামগঞ্জে বিএনপির কৌশলী ‘দ্বৈত’ আর বিদ্রোহী ‘স্বতন্ত্র’: ৫

18

বাঘাইছড়িতে সীমান্ত সড়ক প্রকল্প পরিদর্শন ও অসহায়দের মাঝে স

19

জামায়াতের সঙ্গে জোট চায় না এনসিপির ৩০ নেতা, নাহিদকে চিঠি

20
সর্বশেষ সব খবর