৩ মাস বন্ধ সুন্দরবন: কর্মহীন হাজারো উপকূলীয় বাসিন্দারা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ণ
৩ মাস বন্ধ সুন্দরবন: কর্মহীন হাজারো উপকূলীয় বাসিন্দারা

সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একটি শান্ত নদী (ফাইল ছবি)।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনে আগামী তিন মাসের জন্য পর্যটক ও সর্বস্তরের বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। 

প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে জীববৈচিত্র্য রক্ষার এই সরকারি সিদ্ধান্তে সুন্দরবননির্ভর হাজারো জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, কাঁকড়া সংগ্রহকারী এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষের পরিবারে নেমে এসেছে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মূলত বর্ষা মৌসুমটি সুন্দরবনের বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রধান প্রজননকাল। এ সময় বনের ভেতরের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন এবং বনজ সম্পদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বনাঞ্চলে মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা সীমিত রাখা হয়। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বন বিভাগের এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে স্থানীয়রা স্বাগত জানালেও, আকস্মিক জীবিকার সংকটে পড়েছেন বনের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষ। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার হাজার হাজার পরিবার সুন্দরবন থেকে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ করে জীবন ধারণ করে থাকে। টানা তিন মাস বনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-রোজগারের একমাত্র পথটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের মনিরুল নামের এক জেলে তাঁর ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলেন, “সুন্দরবন ছাড়া আমাদের বিকল্প কোনো আয়ের উৎস নেই। তিন মাস কাজ বন্ধ থাকলে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কাঁকড়া সংগ্রহকারী জানান, “বনের ওপর নির্ভর করেই সারা বছরের সংসার চলে। বন বন্ধের সময় সরকারি সহায়তা না পেলে ঋণ করে সংসার চালাতে হয়।”

নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পেও। সুন্দরবনকেন্দ্রিক ট্যুরিস্ট বোট, ট্রলার, ট্যুর গাইড, স্থানীয় হোটেল-মোটেল এবং পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শত শত শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় এই তিন মাস প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আবু হাসান বলছেন, বনের সুরক্ষায় নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে এই দীর্ঘ সময়ে বননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা কর্মসূচি চালু করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বাঁচাতে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ খাদ্য সহায়তা (রেশন) এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবে।

এ বিষয়ে পশ্চিম বন বিভাগের (খুলনা) ডিএফও এ জেড হাসান বলেন, “আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বহাল থাকবে। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনরায় সুন্দরবনে পর্যটন কার্যক্রম এবং বনজ সম্পদ আহরণের অনুমতি দেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, সুন্দরবনের সুরক্ষার পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের নজরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরএম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন