স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি চুরির আসামীই নিয়ন্ত্রণ করছেন কিশোরগঞ্জ মেডিকেল কলেজের টেন্ডার!

এডমিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৯:৪৪ অপরাহ্ণ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি চুরির আসামীই নিয়ন্ত্রণ করছেন কিশোরগঞ্জ মেডিকেল কলেজের টেন্ডার!

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (SSNIMCH) ভবন।

কিশোরগঞ্জের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (SSNIMCH)-এর প্রায় ১২ কোটি টাকার মালামাল সরবরাহের টেন্ডারকে ঘিরে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন তুঘলকি কাণ্ড। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্তাবলী এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা মূলত উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। ‘নির্ধারিত’ সেই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আবার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ফাইল গায়েব’ মামলার অন্যতম আলোচিত আসামী।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ই-জিপি টেন্ডারে (ID: 125791-1257901) ‘অ্যাডিশনাল টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস’ কলামে এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে যা পিপিআর-২০০৮ (PPR-2008) এর সরাসরি পরিপন্থী। ঢাকার অন্যতম চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বায়োকেয়ার’ (BIOCARE) লিখিত অভিযোগে জানিয়েছে, টেন্ডার জমার আগেই বাধ্যতামূলক স্যাম্পল জমা দেওয়া, চেম্বার অফ কমার্স সার্টিফিকেট এবং নির্দিষ্ট ফরম্যাটে ডিভিসি নম্বরযুক্ত অডিট রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে—যা কেবলমাত্র হাতেগোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হঠিয়ে দিতেই এই ‘কাস্টমাইজড’ শর্তের জাল বিছানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অভিযোগকারী পক্ষ প্রমাণ স্বরূপ কিছু নথিপত্র উপস্থাপন করেছে, যেখানে দেখা যায় মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের একটি টেন্ডারের সঙ্গে এই টেন্ডারের শর্তাবলীর হুবহু মিল রয়েছে। অতীতে ওই একই সিন্ডিকেট মানিকগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। ২০২০ সালে SSNIMCH-এর একটি বিতর্কিত ওয়ার্ক অর্ডার এবং মানিকগঞ্জের একটি কম্পারেটিভ স্টেটমেন্ট (CS) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে বারবার এই বিশেষ প্যাটার্ন অনুসরণ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই টেন্ডার সিন্ডিকেটের পেছনে যার নাম উঠে আসছে, সেই ব্যবসায়ী ২০২১ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৭টি অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ‘ফাইল গায়েব’ সংক্রান্ত মামলায় সিআইডির (CID) হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১ নভেম্বর ২০২১-এ একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া তথ্যে উঠে আসে, ওই সময় তিনি সরকারের প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পরেও সেই একই চক্রের দাপট এবং হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ১২ কোটি টাকার এই টেন্ডারটি গ্রাস করার চেষ্টা চলছে।

বায়োকেয়ার-এর দাবি, তারা যখন এই অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিতে হাসপাতালে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করতে টালবাহানা করেন। এমনকি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, যিনি ফ্যাসিস্ট আমলের একজন সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ—তিনি ওই বিতর্কিত সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দিচ্ছেন। পিপিআর বিধি অনুযায়ী দরদাতার আপিলের অধিকার থাকলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্টের (STD) বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ও বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করা পিপিএ-২০০৬ এর ধারা ১১-এর সরাসরি লঙ্ঘন। যেখানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্স (NINS) বা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের (NICVD) মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, সেখানে কিশোরগঞ্জের এই হাসপাতালে কেন ‘ব্যক্তি কেন্দ্রিক’ শর্ত চাপানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মহলেও। সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, অবিলম্বে এই রহস্যময় টেন্ডারটি বাতিল করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

মন্তব্য করুন