বিদ্রোহী কবির স্মৃতিধন্য দুই বাড়ি

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ
বিদ্রোহী কবির স্মৃতিধন্য দুই বাড়ি

তৎকালীন ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম হলেও, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আজীবন কলম ধরা কাজী নজরুল ইসলাম আজ আমাদের জাতীয় কবি হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। শৈশব ও কৈশোরজুড়ে চরম দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এই কবি খুব অল্প বয়সেই তাঁর মা-বাবাকে হারান। জীবিকার তাগিদে কখনো মসজিদের মুয়াজ্জিন, কখনো লেটো দলের জন্য গান লেখা, আবার কখনো আসানসোলের রুটির দোকানেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।

রুটির দোকানে কাজ করার সময় নজরুলের অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ ১৯১৪ সালে কিশোর নজরুলকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে আসেন। সেই থেকেই ত্রিশালের মাটিতে শুরু হয় কবির জীবনের এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উপজেলার দুটি বাড়ি আজও কবির সেই স্মৃতিময় কৈশোরের ইতিহাস বহন করে চলেছে।

ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে অবস্থিত দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িটিই ছিল কবি নজরুলের প্রথম আবাসস্থল। এখানেই তিনি নতুনভাবে আশ্রয় পেয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করার সুযোগ লাভ করেন। প্রথমে দারোগা সাহেব নজরুলকে ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে পাঠালেও, সেখানে থাকার (জায়গীর) ব্যবস্থা না হওয়ায় তাঁর পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। পরে তাঁকে ভর্তি করানো হয় দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে, যা বর্তমানে ‘নজরুল একাডেমি’ নামে দেশজুড়ে পরিচিত।

কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে দরিরামপুর স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন এই দীর্ঘ পথ কাদা-জল মাড়িয়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো কিশোর নজরুলকে। বর্ষাকালে রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় কবির কষ্টের কথা বিবেচনা করে দারোগা রফিজউল্লাহ তাঁকে ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের এক আত্মীয় কাজী হামিদুল্লাহর বাড়িতে জায়গীর রাখেন।

কিন্তু হামিদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠোর ধার্মিক ব্যক্তি। নজরুলের স্বাধীনচেতা স্বভাব, নিয়মিত নামাজ না পড়া এবং সৃজনশীল চপল মনোভাব তাঁকে বিরক্ত করত। ফলে নানা শাসন ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ধীরে ধীরে সেখানে নজরুলের অবস্থান কঠিন হয়ে ওঠে এবং একসময় তিনি সেই আশ্রয় হারাতে বাধ্য হন।

কাজী হামিদুল্লাহর বাড়ি ছাড়ার পর নজরুল আশ্রয় নেন ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে। এই বাড়ির পূর্বপাশে একটি ছোট পুকুরের ধারে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে থাকতেন তিনি। সেখানেই কাটে তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়। ত্রিশালের এই দুই বাড়িতে মিলিয়ে প্রায় এক বছর অবস্থান করেছিলেন কিশোর নজরুল। এই স্বল্প সময়েই তিনি নিজের মেধা ও অমায়িক ব্যবহারে ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন।

কবির বসবাসের এই দুই বাড়িকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করে বর্তমানে ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’-এর অধীনে দুটি স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।


গত রোববার (১৭ মে) কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এর দ্বিতল ভবনের নিচতলায় কিশোর নজরুলের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক কাঠের খাটটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। একই তলায় রয়েছে একটি ছোট মিলনায়তন এবং ওপরতলায় গড়ে তোলা হয়েছে সমৃদ্ধ পাঠাগার। সেখানে কবির বংশধরদের ছবি সাজানো রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্রের গ্রন্থাগারিক রাসেল হোসেন জানান, প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশ কম। কেন্দ্রটিকে আধুনিক ও ডিজিটাল করা গেলে মানুষের আগ্রহ বাড়ত। নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রটির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। তিনতলা এই ভবনের নিচতলায় মিলনায়তন, দ্বিতীয় তলায় দাপ্তরিক কক্ষ এবং তৃতীয় তলায় স্মৃতিকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার অবস্থিত। এখানে কবির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি পুরোনো দুর্লভ গ্রামোফোন সংরক্ষণ করা হয়েছে। দেয়ালজুড়ে টাঙানো রয়েছে কবির হাতের লেখা কবিতা ও ছবি। মূল ভবনের পাশেই নজরুলের থাকার সেই ঐতিহাসিক ঘরটির মূল কাঠামো ঠিক রেখে নতুনভাবে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পাশে রয়েছে শানবাঁধানো পুকুরঘাট।

বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির বংশধর মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রতি বছর কবির জন্মদিনে (১১ জ্যৈষ্ঠ) এখানে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয়ভাবে বড় আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণীজনেরা আসেন। এই দিনটি আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের।’ পাশে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ থাকায় এই কেন্দ্রে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকে। তবে কাজীর শিমলার দারোগা বাড়িতে মাসে গড়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জন দর্শনার্থী আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিয়া ইয়াসমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কাজীর শিমলার স্মৃতিকেন্দ্রে নজরুলের জীবনী ও কর্মজীবনের তথ্যসমৃদ্ধ গ্যালারি, দুর্লভ ছবির প্রদর্শনী কিংবা অডিও-ভিডিও কর্নার থাকা উচিত ছিল, যেখানে দর্শনার্থীরা নজরুলসংগীত ও কবিতা আবৃত্তি শুনতে পাবেন। এ ছাড়া নিরাপদ পানি ও আধুনিক টয়লেটের মতো নাগরিক সুবিধার অভাব রয়েছে।’ স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার মাস্টারের মতে, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক শুকনি বিল এবং যে বটবৃক্ষের নিচে বসে কবি সাহিত্যচর্চা করতেন, সেগুলোও এখন চরম অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে।

নজরুল ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক মো. ফয়জুল্লাহ রোমেল জানান, বর্তমানে দুই কেন্দ্রেই শিশুদের জন্য নিয়মিত নজরুলসংগীত প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে, যেখানে দুই বাড়ি মিলিয়ে মোট ৬৩ জন শিশু সপ্তাহে দুই দিন তালিম নিচ্ছে। ভবিষ্যতে আবৃত্তি ও নৃত্য প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহের ত্রিশালের মাটিতে কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই দুটি বাড়ি শুধু ইটের স্থাপনা নয়, এগুলো বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিকায়ন ও প্রচারের মাধ্যমে এগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি এখন স্থানীয়দে

মন্তব্য করুন