বিশ্বকাপ সম্প্রচারের খরচ প্রায় শূন্য, আগেরবার ছিল ১৪০ কোটি: তথ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ণ
বিশ্বকাপ সম্প্রচারের খরচ প্রায় শূন্য, আগেরবার ছিল ১৪০ কোটি: তথ্যমন্ত্রী
তথ্য অধিদপ্তরের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

নিজস্ব প্রতিবেদক: কাতারের বিগত বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে গড়ে ওঠা শতকোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি স্পষ্ট করেন, এবার কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) থেকে নামমাত্র খরচে বিশ্বকাপের মিডিয়া রাইটস কেনা হয়েছে।

আজ রোববার সকালে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সাব-লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচারের যাবতীয় খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অথচ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এই মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের মাধ্যমে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন ও আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল।’

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. শাহ আলম, তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব ক্রয়ের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ফিফার কাছ থেকে মাত্র ৩.২ মিলিয়ন ডলারে মিডিয়া রাইটস কিনেছিল সিঙ্গাপুরের একটি বহিরাগত কোম্পানি। এরপর গণমাধ্যমের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘তমা কনস্ট্রাকশন’কে অন্যায়ভাবে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে যুক্ত করা হয়। তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার ওই মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের মাধ্যমে জনগণের ট্যাক্সের ৯৮ কোটি টাকা বিটিভির ফান্ড থেকে পরিশোধ করে খেলা সম্প্রচারের স্বত্ব কেনে।

জহির উদ্দিন স্বপন আরও জানান, এর বাইরে দেশের অন্যান্য বেসরকারি টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যম ওই কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ৩৯ কোটি টাকায় রাইটস সাব-লাইসেন্স করতে বাধ্য হয়। যার মধ্যে টি-স্পোর্টস ২২ কোটি এবং ট্রফি ১৭ কোটি টাকায় রাইটস কিনে নেয়। সব মিলিয়ে একটি বিশেষ বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লাভবান করতে জনগণের ট্যাক্সের প্রায় ১৪০ কোটি টাকার বিশাল তহবিল লোপাট করা হয়।

চলতি বিশ্বকাপের হিসাব তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী জানান, দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর খেলা দেখার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে জনগণের ট্যাক্সের কোনো টাকা যেন অপচয় না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা ছিল। সেই নির্দেশনা মেনে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এবার সরাসরি ফিফার সঙ্গে দফায় দফায় সফল দর-কষাকষির মাধ্যমে মাত্র ৩.৮৫ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকায় মিডিয়া রাইটস কিনেছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি। পরবর্তীতে দেশের আরও চারটি বেসরকারি মাধ্যমের কাছে এটি সাব-লাইসেন্সিং করে ব্যয়ের প্রায় পুরো টাকাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তুলে আনা সম্ভব হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে এই খাতে মাত্র চার-পাঁচ কোটি টাকার মতো সামান্য ঘাটতি রয়েছে, যা খেলা চলাকালীন অর্জিত বিজ্ঞাপন ও রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করে চূড়ান্তভাবে শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ফুটবলের প্রতি দেশের তরুণ প্রজন্মের যে বিপুল আবেগ ও আগ্রহ রয়েছে, তাকে জিম্মি করে বিগত সরকার দুর্নীতির হাতিয়ার বানিয়েছিল। যেমনটি করা হয়েছিল দেশের বিদ্যুৎখাতের চাহিদাকে জিম্মি করে ইনডেমনিটি আইনের মাধ্যমে। ২০২২ সালের সেই ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে ২০২৬ সালের তারেক রহমান সরকারের এই সফল, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পারফরম্যান্স তুলনা করলেই জনগণের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

বিশ্বকাপের সম্প্রচার সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিটিভির মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রশংসা করেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে দর-কষাকষির পর্বে সঠিক তথ্য দিয়ে বিটিভি ও মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করার জন্য দেশের স্পোর্টস রিপোর্টার, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), তথ্য প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, আজ ফাইনাল খেলা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে এই পর্বের সমাপ্তি ঘটছে। তবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এখন থেকেই টেকসই পরিকল্পনা শুরু করবে যেন আগামী বিশ্বকাপগুলোতে এই সম্প্রচার প্রক্রিয়াকে শুধু 'জিরো কস্ট' বা শূন্য ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আরও উন্নত প্রযুক্তির সংযোজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি লাভজনক খাতে রূপান্তর করা যায়।

মন্তব্য করুন