ব্রেইন টিউমারের যে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না
লাইফস্টাইল ডেস্ক : আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে একটানা দীর্ঘক্ষণ কাজ করার কারণে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের চরম ক্লান্তি, মানসিক অলসতা বা হঠাৎ হালকা মাথা ঘোরার মতো সমস্যায় আমরা কমবেশি প্রায় সবাই ভুগে থাকি। বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত মানসিক স্ট্রেস (Stress) এবং শারীরিক ক্লান্তি যেন আমাদের দৈনন্দিন নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আর এই কারণেই অনেক সময় সাধারণ ছোটখাটো শারীরিক অসুবিধা এবং শরীরের ভেতর বাসা বাঁধা কোনো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কিছু নির্দিষ্ট উপসর্গ যদি কোনো বিরতি ছাড়াই শরীরে ক্রমাগত দেখা দিতে থাকে, তবে কোনো প্রকার অবহেলা না করে দ্রুত সঠিক চিকিৎসার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করা বা দেরিতে শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারের মধ্যে ব্রেন টিউমার (Brain Tumor) অন্যতম। কারণ এর প্রাথমিক ও সূক্ষ্ম লক্ষণগুলোকে বেশিরভাগ মানুষই প্রাথমিক অবস্থায় মাইগ্রেন বা সাধারণ কাজের চাপের মাথাব্যথা ভেবে ভুল করে থাকেন, যা পরবর্তীতে প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টা ৪৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল’ ও ‘স্বাস্থ্য’ বিভাগের এক বিশেষ সচেতনতামূলক প্রতিবেদনে ব্রেইন টিউমারের এমন কিছু মারাত্মক লক্ষণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যা কখনোই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়
ব্রেইন টিউমারের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে একটি হলো এমন এক ধরণের মাথাব্যথা, যা সাধারণ স্ট্রেস-সম্পর্কিত মাথাব্যথা বা চেনা মাইগ্রেনের ব্যথার মতো অনুভূত হয় না। এই ব্যথাটি মূলত সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, খুব ঘন ঘন ঘটতে পারে এবং মাথার ভেতর এক ধরণের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে, রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও সকালের দিকে এই ব্যথার তীব্রতা অনেক বেশি থাকে। তবে বেশিরভাগ মানুষই প্রাথমিক অবস্থায় এটিকে ঘুমের অভাব, পানিশূন্যতা বা অতিরিক্ত কাজের চাপ বলে অবহেলা করে উড়িয়ে দেন।
খাবারের কোনো অনিয়ম বা পেটের সমস্যা ছাড়াই যদি ঘন ঘন বমি বমি ভাব বা সরাসরি বমি হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়, বিশেষ করে সকালের দিকে ঘুম থেকে ওঠার পর, তবে তা মস্তিষ্কে উচ্চ রক্তচাপ বা টিউমারের কারণে ফ্লুইডের চাপ বৃদ্ধির অন্যতম সংকেত হতে পারে। সাধারণ মানুষ এই লক্ষণগুলোকে এসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সাধারণ সমস্যার জন্য দায়ী করে প্রতিনিয়ত ওটিসি (OTC) ওষুধ খেয়ে চেপে রাখেন। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ ডেনজার সাইনটি অলক্ষিত ও চিকিৎসাবিহীন থেকে যায়।
বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী 'জ্যামা নেটওয়ার্ক'-এ (JAMA Network) প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা ও গবেষণা অনুসারে, মস্তিষ্কের টিউমার যখন বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন তা মানুষের দৃষ্টিশক্তির মূল স্নায়ু বা এর চারপাশের অঞ্চলগুলোকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে কোনো পূর্ব ইতিহাস ছাড়াই চোখের দৃষ্টি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যাওয়া, একটি জিনিসকে দুটো দেখা (Double Vision), সাময়িকভাবে চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া, চোখের সামনে হঠাৎ আলোর ঝলকানি ওঠা কিংবা চোখের চারপাশের পাশ থেকে কোনো বস্তু দেখতে অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের উপসর্গগুলোকে বেশিরভাগ সময় মানুষ চোখের সাধারণ ক্লান্তি বা অতিরিক্ত মোবাইল-ল্যাপটপের স্ক্রিন টাইমের কুফল মনে করে ভুল করেন।
মস্তিষ্কে টিউমার বাসা বাঁধলে কিছু ব্যক্তির মধ্যে ঘন ঘন সাধারণ বিষয় ভুলে যাওয়া, যেকোনো কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া, তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি কিংবা স্বাভাবিক কথোপকথনের সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অনাকাঙ্ক্ষিত অসুবিধা অনুভব করার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই উপসর্গগুলোকেও মানুষ মানসিক অবসাদ, কাজের অতিরিক্ত চাপ বা ‘বার্নআউট’ (Burnout) মনে করে উপেক্ষা করেন। কিন্তু সব সময় তা সাধারণ অবসাদ না-ও হতে পারে। তাই এ ধরনের লক্ষণ ঘন ঘন দেখা দিলে অবিলম্বে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অনেক সময় ব্রেইন টিউমারের রোগীরা হঠাৎ করে শরীরের যেকোনো একপাশে, এক বা উভয় অঙ্গের (হাত অথবা পা) তীব্র দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্যারাপারেসিস’ (Paraparesis) বলা হয়। হঠাৎ করে হাত থেকে কোনো জিনিস পড়ে যাওয়া বা এক পা টানতে সমস্যা হওয়া এই রোগের মারাত্মক লক্ষণ। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব একজন নিউরোলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
কোনো শারীরিক দুর্বলতা ছাড়াই হঠাৎ করে তীব্র মাথা ঘোরা, সোজা হয়ে হাঁটতে অসুবিধা হওয়া কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে সিঁড়ি ব্যবহার করার সময় শরীর অস্থির বা ভারসাম্যহীন বোধ করা মস্তিষ্কের ভেতরের বড় কোনো সমস্যার স্পষ্ট সংকেত দেয়। এই লক্ষণগুলোকে বেশিরভাগ সময় সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বা নিম্ন রক্তচাপ (Low Blood Pressure) বলে মনে করা হয়। তবে এ ধরনের মাথা ঘোরার লক্ষণ বারবার ফিরে এলে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে এমআরআই (MRI) বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা অপরিহার্য।
জান্নাত সকালবেলা
|