দুই দিনে ইরানে ১৭০ লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪১ অপরাহ্ণ
দুই দিনে ইরানে ১৭০ লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবারও কাঁপিয়ে তুলেছে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত অন্তত ১৭০টি কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী সামরিক হামলা চালানোর দাবি করেছে মার্কিন যৌথ বাহিনী। এই বিধ্বংসী সামরিক অভিযানের সমান্তরালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে অতি সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন কার্যত সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং এটি আর অস্তিত্বশীল নেই। ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও আগ্রাসী হামলার পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জ্বালানি পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-র নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম বৈশ্বিক উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন (CNN) এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পেন্টাগন তথা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে ইরানের বিভিন্ন স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, আত্মঘাতী ড্রোন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, অত্যাধুনিক অস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং লজিস্টিক সামরিক অবকাঠামোকে নিখুঁতভাবে নিশানা করে অন্তত ১৭০টি পৃথক আকাশপথ ও নৌপথের হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই সাড়াশী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন সেন্টকম (CENTCOM) ও তার মিত্রদের ওপর ইরানের সম্ভাব্য বড় ধরণের পাল্টা হামলার ঝুঁকি এবং তাদের সামগ্রিক সামরিক আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে সাময়িকভাবে পঙ্গু ও দুর্বল করে দেওয়া।

এদিকে হোয়াইট হাউজ থেকে দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, “ইরানের উস্কানিমূলক আচরণের কারণে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় ঘোষিত ও স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মাঠপর্যায়ে কার্যত আর কোনোভাবেই কার্যকর বা বৈধ নেই।” ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ও কঠোর যুদ্ধংদেহী মন্তব্যের পর বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে বড় প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা কমানোর আর কোনো আলোচনার পথ আদৌ খোলা রইল কি না।

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক উপায়ে ভেঙে যাওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এই আঞ্চলিক সংঘাত আরও মারাত্মকভাবে বিস্তৃত বা ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদী আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত স্ট্রেইট অব হরমূজ বা হরমুজ প্রণালীর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত অপরিশোধিত খনিজ তেলের (Crude Oil) একটি বিশাল ও সিংহভাগ অংশ প্রতিদিন এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়েই বৈশ্বিক গন্তব্যে পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলসীমায় যেকোনো ধরনের সামরিক শক্তি প্রদর্শন বা সংঘাত সৃষ্টি হলে তা মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল অস্থিরতা তৈরি করবে, যার প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় উল্লেখযোগ্যভাবে আকাশচুম্বী হয়ে যেতে পারে।

আমেরিকার এই নজিরবিহীন ও বড় ধরণের বিমান হামলার বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকাল পর্যন্ত ইরানের উচ্চপর্যায়ের সামরিক বাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। একইভাবে এই ১৭০টি স্পটে মার্কিন বোমাবর্ষণের ফলে ইরানি বাহিনীর কি পরিমাণ বৈষয়িক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা সামরিক-বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তেহরান প্রকাশ করেনি।

তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান চরম যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে সংঘাত আরও তীব্র ও সর্বাত্মক রূপ নেওয়ার পরিষ্কার ইঙ্গিত মিললেও—একেবারে শেষ মুহূর্তের আলোচনার পথ পুরোপুরি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। তবে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভাগ্য, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সম্ভাব্য নতুন কোনো বড় স্থল ও আকাশ অভিযান এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর একক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের লড়াই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান ও সংঘাতময় ইস্যু হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন