আজ বুধবার (৩ জুন) সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামী জীবন’ ও ‘কুরআন-সুন্নাহর আলো’ বিভাগের এক বিশেষ ধর্মীয় নিবন্ধে আল্লাহর প্রিয় ও মকবুল বান্দা হওয়ার সহজ আধ্যাত্মিক পথ ও আমলসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, যে বান্দাকে মহান আল্লাহ নিজে ভালোবাসেন, তাঁর পুরো জীবন দুনিয়াতেই বরকতময় হয়ে ওঠে। স্রষ্টার ভালোবাসায় তাঁর অন্তরে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি নেমে আসে, দুনিয়াতে তাঁর করা প্রতিটি নেক দোয়া কবুল হয় এবং আখিরাতের কঠিন ময়দানে তাঁর জন্য থাকে চিরস্থায়ী জান্নাতের মহাসুসংবাদ। আর আল্লাহর এই বিশেষ প্রিয় বান্দা হওয়ার রাজকীয় পথটি শুরু হয় মূলত আন্তরিক তাওবা, গভীর আত্মশুদ্ধি এবং নিজের আমল-আখলাক সংশোধনের মাধ্যমে। মানুষ হিসেবে ভুল করা কিংবা গুনাহের অন্ধকারে জড়িয়ে পড়াটাই মানবীয় সহজাত দুর্বলতা। কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান ও বুদ্ধিমান মুমিন তো সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের ভুল বুঝতে পারামাত্রই আল্লাহর দরবারে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, “তবে যারা এরপর তাওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে, তাহলে আল্লাহ তো অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা : নুর, আয়াত : ৫)
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো খাঁটি মনে আন্তরিকভাবে তাওবা করা। তাওবা কেবল মুখে কিছু শব্দের উচ্চারণ নয়; বরং এটি হলো হৃদয়ের গভীর থেকে আসা অনুতাপ, অতীতের গুনাহ চিরতরে বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে তাওবা করে, সে এমন এক পবিত্র ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, যার আমলনামায় কোনো গুনাহই নেই।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৪২৫০)
আল্লাহ তাআলা শুধু মুখে তাওবা করতে বলেননি; বরং এর সাথে শর্ত দিয়েছেন— ‘যারা নিজেদের সংশোধন করে’। প্রকৃত তাওবার মূল প্রমাণ হলো গুনাহর জীবন ছেড়ে সৎ পথে ফিরে আসা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যত্নশীল হওয়া, সর্বপ্রকার হারাম কাজ ও উপার্জন বর্জন করা, মানুষের হক বা অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা, নিজের চরিত্র সুন্দর করা এবং সমাজে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলাই হলো আত্মসংশোধনের প্রধান নিদর্শন।
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম প্রধান উপায় হলো সর্বাবস্থায় তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য করা। যারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের (পরহেজগারদের) ভালোবাসেন।” (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪)
ফরজ ইবাদতসমূহ সঠিকভাবে আদায়ের পাশাপাশি নফল নামাজ, শেষ রাতের তাহাজ্জুদ, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার এবং আল্লাহর রাস্তায় গোপন দান-সদকা বান্দাকে আল্লাহর আরশের আরো নিকটবর্তী করে দেয়। একটি বিখ্যাত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার এত বেশি নিকটবর্তী হতে থাকে যে, একপর্যায়ে আমি তাকে নিজে ভালোবাসতে শুরু করি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৫০২)
মানুষকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে পুনরায় পাপে লিপ্ত করা হলো অভিশপ্ত শয়তানের অন্যতম প্রধান কৌশল। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন ভালো করেই জানে, আল্লাহর ক্ষমার পরিধি ও রহমত তার জীবনের সমস্ত গুনাহের চেয়েও কোটি গুণ বড়। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হয়ো না।” (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
সুতরাং, আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া কোনো কঠিন বা অসম্ভব বিষয় নয়; বরং এটি প্রতিটি সাধারণ মুমিনের জন্যই উন্মুক্ত একটি রহমতের পথ। মানুষ যত বড় অপরাধী বা গুনাহগারই হোক না কেন, সে যদি আজই অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং নিজের জীবনকে ইসলাম অনুযায়ী সংশোধন করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে নিজের রহমতের শীতল ছায়ায় আশ্রয় দেন।
জান্নাত সকালবেলা