তীব্র গরমে আদরের পোষা প্রাণীর যত্ন ও খাদ্য তালিকা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০২:৩৮ অপরাহ্ণ
তীব্র গরমে আদরের পোষা প্রাণীর যত্ন ও খাদ্য তালিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক: আমাদের ব্যস্ত যান্ত্রিক ও নাগরিক জীবনে ঘরের পোষা প্রাণী বা ‘পেট’ (Pet) এখন আর শুধু শখের কোনো জিনিস নয়, বরং তারা আমাদের প্রতিটি পরিবারের একেকজন অবিচ্ছেদ্য ও পরম ভালোবাসার সদস্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে আমাদের দেশে ‘পেট প্যারেন্টিং’ বা ঘরে পোষা প্রাণী রাখার প্রবণতা ও জনপ্রিয়তা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একটি অবলা প্রাণীকে ভালোবেসে ঘরে আনা মানেই শুধু শখ পূরণ নয়; বরং তাদের সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সঠিক নিয়মে যত্ন নেওয়া, উপযুক্ত থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করা, সুষম খাবার এবং অসুস্থ হলে দ্রুত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাও আমাদের এক বিশাল দায়িত্ব।

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ফিচার’ ও ‘লাইফস্টাইল ও লিভিং’ বিভাগের এক বিশেষ সচেতনতামূলক প্রতিবেদনে একজন অভিজ্ঞ পেট প্র্যাকটিশনার হিসেবে পোষা প্রাণীর রোজকার পুষ্টি, সাধারণ যত্ন এবং এই তীব্র গরমে তাদের সুরক্ষিত রাখার কিছু জরুরি বৈজ্ঞানিক উপায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

পোষা প্রাণীর সুস্বাস্থ্যের প্রধান ভিত্তি হলো তাদের সঠিক ও সুষম খাদ্যতালিকা। মানুষ এবং প্রাণীর শরীরের মেটাবলিজম প্রসেস বা বিপাক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই ‘আমরা মানুষরা যা খাই, ওরাও তাই খাবে’— এই প্রচলিত ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং অনেক সময় প্রাণীদের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক প্রমাণিত হতে পারে।

বিড়াল স্বভাবগতভাবেই শতভাগ মাংসাশী প্রাণী (Obligate Carnivore)। ওদের শরীরের জন্য ‘টোরিন’ (Taurine) নামক বিশেষ অ্যামাইনো অ্যাসিড অত্যন্ত জরুরি, যা কেবল প্রাণিজ আমিষ বা মাংস থেকেই পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাদের ঘরে তৈরি খাবার দিতে চাইলে— হাড় ছাড়া মুরগির মাংস, কলিজা (মাঝে মাঝে পরিমাণমতো), কাঁটা ছাড়া সিদ্ধ মাছ এবং এর সাথে মিষ্টি কুমড়া, গাজর বা মিষ্টি আলু খুব সামান্য পরিমাণে সেদ্ধ করে চটকে দিতে পারেন, যা মোট খাবারের সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া বাজারে পাওয়া যাওয়া ভালো ব্র্যান্ডের উন্নত ড্রাই বা ওয়েট ফুডও ওদের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখে।

কুকুর মূলত সর্বভুক প্রাণী (Omnivores)। তাই তাদের দৈনিক খাবারে প্রোটিনের পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের সমান প্রয়োজন রয়েছে। কুকুরের খাবারে হাড় ছাড়া মাংসের সাথে ভাত এবং সিদ্ধ সবজি যেমন— গাজর, পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি মিশিয়ে দেওয়া উচিত। তবে কুকুরকে কখনোই শক্ত ও সুচালো হাড় দেওয়া যাবে না; কারণ এগুলো অনেক সময় ওদের ওরাল ক্যাভিটিতে (মুখের ভেতর) মারাত্মক ইনজুরিসহ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল পারফোরেশন বা পাকস্থলী-অন্ত্র ফুটো করে দেওয়ার মতো জটিলতা তৈরি করে।

পাখিকে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বীজ জাতীয় খাবার দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে শুধু একঘেয়ে কাউন বা চীনা না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বীজের মিশ্রণ (Seed Mix) এবং এর সাথে প্রতিদিন কিছু পরিমাণে তাজা শাকসবজি দেওয়া ভালো। অন্যদিকে খরগোশের পরিপাকতন্ত্র বা ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে সচল রাখতে প্রায় ৮০ শতাংশই কাঁচা ঘাস বা ‘টিমোথি হে’ (Timothy Hay) প্রয়োজন হয়, যা একই সাথে তাদের দাঁত অতিরিক্ত বড় হওয়া (Malocclusion) রোধ করতে সাহায্য করে।

অনেক সময় আমরা আমাদের প্রিয় পোষ্যটিকে অতিরিক্ত আদর করে নিজের প্লেট থেকে এমন কিছু খেতে দিই, যা তাদের শরীরের জন্য মারাত্মক টক্সিসিটি বা বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।

এগুলো মানুষের জন্য রিফ্রেশিং হলেও এগুলোতে থাকা থিওব্রোমিন ও ক্যাফেইন পোষা প্রাণীর হার্ট ও নার্ভাস সিস্টেম (স্নায়ুতন্ত্র) নিমেষেই বিকল করে দিতে পারে। এগুলো কুকুর-বিড়ালের লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ধ্বংস করে তীব্র অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা তৈরি করে। বিশেষ করে কুকুরের জন্য এই ফলগুলো মারাত্মক বিপজ্জনক, যা একিউট কিডনি ফেইলিউর বা আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রাপ্তবয়স্ক কুকুর বা বিড়ালের শরীরে ল্যাক্টোজ হজম করার মতো প্রয়োজনীয় এনজাইম থাকে না। ফলে গরুর দুধ দিলে তাদের তীব্র ডায়রিয়া, বমি ও ডিহাইড্রেশন হতে পারে।

“Prevention is better than cure”— এই চিরন্তন বাক্যটি মাথায় রেখে পোষা প্রাণীর যত্নে আমাদের কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেমন— সঠিক বয়সে এবং সঠিক সময়ে নিয়মিত সংক্রামক রোগের টিকা বা ভ্যাকসিন প্রদান করা। বিশেষ করে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জীবনের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘জলাতঙ্ক’ বা রেবিস (Rabies) ভ্যাকসিন দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া পোষা প্রাণীর জন্মের পর প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি মাসে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে প্রতি ৩ মাস অন্তর একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমির ওষুধ বা ডিওয়ার্মিং করানো বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি বহিঃপরজীবী যেমন— উকুন বা টিক (Tick, Flea) থাকলে তারও দ্রুত চিকিৎসা করানো জরুরি।

মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে বাইরের উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বিড়াল, কুকুর বা পাখির ক্ষেত্রে সেই প্রাকৃতিক সুবিধা নেই। কুকুর-বিড়াল মূলত জিহ্বা বের করে দ্রুত হাঁপানো বা লালা বের করার মাধ্যমে এবং পাখি মুখ হাঁ করে ও ডানা ফুলিয়ে নিজেদের শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করে থাকে। ফলে অতিরিক্ত গরমে তারা খুব সহজেই হিটস্ট্রোকের (Heatstroke) শিকার হতে পারে।

তাই ওদের হাইপারথার্মিয়া ও ডিহাইড্রেশন রোধের জন্য সবসময় ঘরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানীয় জলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ঘরে যেন যথাযথ বাতাস চলাচলের বা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গরমে পোষা প্রাণীর খাবারের রুচি অনেক কমে যায়, তাই এ সময় সহজে হজম হয় এমন তরল ও হালকা খাদ্য দিতে হবে। বড় লোমবিশিষ্ট প্রাণীর ক্ষেত্রে লোম ট্রিম বা ছোট করে দিতে হবে এবং স্বাভাবিক পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করে দেওয়া যেতে পারে। পাখিদের মেটাবলিক রেট বেশি হওয়ায় ওরা গরম একদম সহ্য করতে পারে না; তাই সরাসরি রোদ পড়ে এমন জায়গায় পাখির খাঁচা রাখা যাবে না এবং ছড়ানো পাত্রে পানি দিলে ওরা ইচ্ছেমতো ডানা ভিজিয়ে গোসল করতে পারে।

অতিরিক্ত গরমে যদি আপনার পোষা প্রাণীর মধ্যে হিটস্ট্রোকের স্পষ্ট লক্ষণ দেখেন— যেমন অতিরিক্ত হাঁপানো, মুখ দিয়ে ফেনা বা আঠালো লালা ঝরা এবং থার্মোমিটারে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হওয়া; তবে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত না হয়ে প্রাণীটিকে দ্রুত কোনো ঠান্ডা বা এসি রুমে নিয়ে যান। এরপর নরমাল পানি দিয়ে পুরো শরীর, বিশেষ করে মাথা, বুক, পেট ও পাগুলো ভালো করে মুছে দিন এবং যথাসম্ভব দ্রুত নিকটস্থ কোনো ভেটেরিনারি ক্লিনিকে নিয়ে যান।

অনেক সময় বিশেষ পারিবারিক প্রয়োজনে বা ঈদের লম্বা ছুটিতে আমাদের আদরের পোষা প্রাণীকে ঘরে একা রেখে বাইরে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে তাদের অবহেলায় না রেখে নির্ভরযোগ্য পেশাদার ‘পেট বোর্ডিং’ বা ‘ফস্টার হোমে’ রাখা যেতে পারে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় বেশকিছু বিশ্বস্ত ফস্টার হোম গড়ে উঠেছে; যেমন— মিরপুর ও গুলশান ব্রাঞ্চের ‘ফারিঘর’ (Furryghor), ‘পওভিলা বোর্ডিং’ (PawVilla Boarding) এবং ‘সুজির বাড়ি’।

পরিশেষে একজন পেট প্র্যাকটিশনার হিসেবে সকল পেট প্যারেন্টের প্রতি আমার আকুল আহ্বান থাকবে— ওরা যেহেতু মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, তাই ওদের নীরব চোখের ভাষা, ক্ষুধা এবং দৈনন্দিন আচরণ দেখে আপনাকে বুঝতে হবে তারা সুস্থ নাকি অসুস্থ। অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের অপেশাদার ও ভুল পরামর্শে নিজের ইচ্ছেমতো পোষা প্রাণীকে মানুষের ওষুধ খাইয়ে দেন অনেকেই। মনে রাখবেন, মানুষের মাথার ব্যথার একটি সামান্য প্যারাসিটামল বা নাপা ট্যাবলেটও একটি বিড়ালের দ্রুত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আপনার আদরের পোষ্যর যেকোনো শারীরিক সমস্যায় সবসময় একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের (Registered Veterinarian) পরামর্শ অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিন। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব আদরের পোষা প্রাণীরা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন