মৃত্যুর হাজারো বছর পরও মমিতে সক্রিয় জীবাণু

প্রকাশ: বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০২:৫৬ অপরাহ্ণ
মৃত্যুর হাজারো বছর পরও  মমিতে সক্রিয় জীবাণু
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই যুগেও প্রাচীন পৃথিবীর বহু রহস্য মানবজাতিকে বারবার স্তব্ধ করে দেয়। তেমনি এক হাড়হিম করা ও বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের তথ্য সামনে এসেছে। হাজার হাজার বছর আগে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির মমির শরীরের ভেতরে এখনো পুরোপুরি সক্রিয় ও জীবিত রয়েছে অতি ক্ষুদ্র অণুজীবের এক প্রাগৈতিহাসিক জগৎ। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োম’ (Microbiome)-এ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই অবিশ্বাস্য তথ্য প্রমাণিত হয়েছে।

আজ বুধবার (৩ জুন) দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘পাঁচফোড়ন’ ও ‘বিজ্ঞান, বিচিত্র ও মহাবিশ্ব’ বিভাগের এক বিশেষ ফিচারে এই চাঞ্চল্যকর বৈজ্ঞানিক গবেষণার আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ মহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ও সুপরিচিত বরফ-মমি ‘ওৎজি দ্য আইসম্যান’ (Ötzi the Iceman)-এর অবয়ব ও শরীরের ভেতরে প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্ত্রের ক্ষতিকর ও উপকারী জীবাণু এবং অত্যন্ত শীতল বা চরম বৈরী পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম এমন কিছু খামিরজাতীয় (Yeast) অণুজীব এখনো সমানভাবে সক্রিয় ও সচল রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগে ইউরোপের ইতালির আল্পস পর্বতমালায় অজ্ঞাত এক শত্রুর তীরের আঘাতে নিহত হয়েছিলেন ওৎজি নামক এই শিকারী পুরুষ। ১৯৯১ সালে বরফাবৃত পর্বতমালায় তাঁর অক্ষত দেহটি আবিষ্কারের পর থেকে তাকে দীর্ঘকাল ধরে ল্যাবরেটরির কৃত্রিম হিমাগারে মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-৬°C) চরম তাপমাত্রায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সাধারণ বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল, এতো দীর্ঘ সময় ধরে এই তীব্র শীতল পরিবেশে থাকার কারণে শরীরের ভেতরের সব ধরনের জৈবিক কার্যক্রম ও অণুজীবের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বন্ধ বা ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণাকে এক ধাক্কায় ভুল প্রমাণিত করেছে।

বিশিষ্ট অণুজীব বিজ্ঞানী মোহামেদ সারহান এবং তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল ওৎজির শরীরের ত্বক, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নরম টিস্যু, অন্ত্র এবং মমিটি গলে যাওয়া বরফের পানির নমুনা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই প্রাচীন ও সক্রিয় জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পান।

ডিএনএ ও মাইক্রোবায়াল গবেষণায় দেখা গেছে, ওৎজির অন্ত্রে বা পাকস্থলীতে এখনো জীবন্ত থাকা সক্রিয় জীবাণুগুলো তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে গ্রহণ করা শেষ খাবারের উপাদানের সাথে হুবহু মিল খুঁজে দেয়। ওৎজির শেষ খাবারের তালিকায় ছিল উচ্চ চর্বিযুক্ত বন্য প্রাণীর (আইবেক্স বা হরিণ) মাংস, প্রাচীন যুগের এক বিশেষ বন্য শস্য এবং এক প্রকার বিষাক্ত ফার্ন উদ্ভিদ।

গবেষকেরা ওৎজির শরীরে আরও বেশ কয়েকটি অত্যন্ত বিরল ও প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন, যা আধুনিক যুগের শহুরে বা উন্নত বিশ্বে বসবাসকারী মানুষের শরীরে আর কোনোভাবেই পাওয়া যায় না। তবে বিস্ময়করভাবে, বর্তমান বিশ্বের আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনের কিছু বিচ্ছিন্ন ও প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শরীরে এখনো এই আদিম ব্যাকটেরিয়াগুলোর অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে।

এই গবেষণার সবচেয়ে চোখ কপালে তোলার মতো এবং চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, ওৎজির শরীরে থাকা কিছু নির্দিষ্ট খামিরজাতীয় অণুজীব বা ফাঙ্গাস গত নয় বছরে মাইনাস তাপমাত্রার ভেতরেই বংশবৃদ্ধি করেছে এবং সংখ্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এই অণুজীবগুলো মমিটিকে পচন থেকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখার জন্য ল্যাবে ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষতিকর জীবাণুনাশক রাসায়নিক পদার্থগুলোকে নিজেদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে বেঁচে থাকার ও টিকে থাকার এক বিশেষ অতি-মানবিক সক্ষমতা অর্জন করে নিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নতুন করে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদি এসব প্রাচীন অণুজীব হিমশীতল পরিবেশ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের তৈরি তীব্র রাসায়নিকের ব্যবহার সত্ত্বেও দিব্যি বেঁচে ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে, তবে বিশ্বের নামী-দামী জাদুঘরগুলো তাদের সংগ্রহে থাকা হাজার বছরের প্রাচীন মানব নিদর্শন ও মমিগুলোকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও সুরক্ষিত রাখবে? তবে গবেষকদের মতে, ওৎজির শরীরের এই জীবিত অণুজীবসমূহ মানবস্বাস্থ্য, প্রাচীন মহামারী, রোগের বিবর্তন ও প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনযাত্রা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন