চরম তাপপ্রবাহের কবলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ণ
চরম তাপপ্রবাহের কবলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের মৌসুম সবে শুরু হলেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে প্রাণঘাতী তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই চরম পরিস্থিতি আসলে আরও দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ দিনগুলোর এক উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ পূর্বাভাস।

গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ইউরোপের ওপর দিয়ে দুটি রেকর্ডভাঙা ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এখানেই শেষ নয়, আগামী সপ্তাহে সেখানে আরও একটি নতুন তাপপ্রবাহ আঘাত হানতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলও তীব্র গরম এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক গরমের মূল কারণ হলো শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ (Heat Dome) বা তাপ-গম্বুজ। এটি মূলত উচ্চচাপের এমন একটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থা, যা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে উষ্ণ বায়ুকে ঢাকনার মতো আটকে রাখে। তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। এর পাশাপাশি চলমান এল নিনো (El Niño) এবং বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের রেকর্ড উচ্চ তাপমাত্রাও বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জোরালো করে তুলছে।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধির কারণেও চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা এখন ঘন ঘন, তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক দ্রুত গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপের সর্বশেষ তাপপ্রবাহটি শুধু ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহগুলোর একটিই নয়, বরং কয়েক দশক আগে—যখন মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এতটা প্রকট ছিল না—তখন এমন তাপমাত্রা দেখা যাওয়া "প্রায় অসম্ভব" ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির (Brown University) বিখ্যাত জলবায়ুবিজ্ঞানী কিম কব একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, "বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধিও চরম তাপমাত্রার ঘটনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।"

এল নিনোর ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চলমান এল নিনো সাধারণত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বহুগুণ বাড়ায় এবং এর প্রভাবে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। চলতি বছরেও এর কিছুটা প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তবে এল নিনোর পূর্ণ প্রভাব সাধারণত এটি তৈরি হওয়ার কয়েক মাস পর স্পষ্ট হয়। চলতি বছরের ১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এই এল নিনোর ঘোষণা করা হয়েছে, তাই এর আসল রূপ এখনও সামনে আসেনি।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির (Columbia University) জলবায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল টিপেট একটি গণমাধ্যমকে জানান, গড় হিসেব করলে এল নিনোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ার সরাসরি কোনো শক্তিশালী সম্পর্ক থাকে না। বরং শরৎ ও শীতকালের আবহাওয়াতেই এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।

তবে বিজ্ঞানী কিম কবের মতে, এবারের এল নিনো কয়েকটি দিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। বছরের শুরুতেই এটি অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী রূপ নিয়েছে এবং এমন এক পৃথিবীতে এটি ঘটছে, যা অতীতের যেকোনো দশকের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ। ফলে এর প্রভাবও ভিন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, "প্রতিটি এল নিনো থেকে আমরা নতুন কিছু শিখছি, যা উষ্ণ পৃথিবীতে এর প্রভাব সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে আরও সমৃদ্ধ করছে।"

বিজ্ঞানীদের ধারণা, চলতি বছরের চরম তাপপ্রবাহে এল নিনোর ভূমিকা এখন সীমিত মনে হলেও, আগামী গ্রীষ্মে এটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে আরও ভয়ংকর তাপপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।

জেট স্ট্রিমের প্রভাব

আরেক বিশিষ্ট জলবায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল ই. ম্যান আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে 'জেট স্ট্রিম' এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। উচ্চ বায়ুমণ্ডলের এই শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহটি মূলত পৃথিবীর সামগ্রিক আবহাওয়া ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

জেট স্ট্রিম যখন অস্বাভাবিকভাবে ঢেউখেলানো আকার ধারণ করে এবং দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় স্থির থাকে, তখন 'হিট ডোম' বা গরম বাতাস কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত একই জায়গায় থমকে থাকে। এর ফলে দক্ষিণ দিক থেকে উষ্ণ বায়ু ক্রমাগত উত্তর দিকে প্রবাহিত হয় এবং তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।

মাইকেল ম্যান ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ ধরনের স্থির জেট স্ট্রিমের ঘটনা অনেক বেড়েছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের যে রেকর্ড উচ্চ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, তা আংশিকভাবে এল নিনো এবং আংশিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নেরই ফল। উষ্ণ সমুদ্র বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত আর্দ্রতা যোগ করে, যা ঝড়কে আরও শক্তিশালী করে এবং ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।"

মন্তব্য করুন