বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন কি এবার পূরণ করবেন আর্লিং হালান্ড?

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ণ
বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন কি এবার পূরণ করবেন আর্লিং হালান্ড?

স্পোর্টস ডেস্ক: ক্লাব ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে প্রতিনিয়ত গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া আর্লিং হালান্ড এবার একই খুনে ফর্মের ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছেন উত্তর আমেরিকায় চলমান ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপেও। টুর্নামেন্টের বহুল আলোচিত শেষ ষোলোর (রাউন্ড অব ১৬) নক-আউট ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় নিশ্চিত করার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন নরওয়ের এই গোল মেশিন। ম্যাচে তাঁর চোখ ধাঁধানো জোড়া গোলের ওপর ভর করেই ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তিদের কাঁদিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে নরওয়ে।

এই অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে হালান্ড শুধু নিজের দলকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতাতেই নিয়ে যাননি, বরং নিজের পরিবারের ফুটবল ইতিহাসকেও এক আবেগঘন তুলিতে নতুনভাবে লিখছেন। কারণ, এই বিশ্বমঞ্চে হালান্ডের লড়াইটা এখন আর কেবল ব্যক্তিগত ট্রফি বা অর্জনের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই—এটি মূলত তাঁর বাবা ও সাবেক নরওয়েজীয় ফুটবলার আলফ-ইঙ্গে হালান্ডের তিন দশক পুরোনো এক অসমাপ্ত ও অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের মহাকাব্যিক গল্প।

ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে নরওয়ের জাতীয় জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন আর্লিং হালান্ডের বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড। কাকতালীয়ভাবে, সেই আসরের গ্রুপ পর্বেও ব্রাজিলকে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল নরওয়ে। তবে সেবার শেষ ষোলোর নক-আউট ম্যাচে শক্তিশালী ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল আলফ-ইঙ্গেদের। নরওয়েকে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার সেই সোনালী স্বপ্ন তখন অপূর্ণ ও অধরাই থেকে গিয়েছিল বাবার।

প্রায় তিন দশক পর, ২০২৬ সালের এই জুলাইয়ে এসে বিশ্বমঞ্চে যেন সেই একই চিত্রনাট্য নতুন করে ফিরে এসেছে, তবে এবার মাঠের মূল নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন ছেলে আর্লিং হালান্ড। ব্রাজিলের বিশ্বসেরা ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে প্রথমটি দুর্দান্ত হেডে এবং দ্বিতীয়টি চেনা ভঙ্গিতে বাঁ পায়ের নিখুঁত ও বুলেট গতির শটে—এই জোড়া গোল করে নরওয়েকে বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবার শেষ আটে পৌঁছে দিয়েছেন এই তরুণ মহাতারকা।

চলমান এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নিজের নামের পাশে মোট ৭টি গোল যুক্ত করেছেন হালান্ড। যার সুবাদে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের দৌড়ে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি এবং ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে একদম সমান অবস্থানে (যৌথভাবে শীর্ষে) রয়েছেন তিনি।

চলতি বিশ্বকাপে নরওয়ের এই রূপকথার মতো পথচলার পেছনে অবশ্য শুধু একা হালান্ডই নন, মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ও দারুণ সৃজনশীল ভূমিকা রাখছেন দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড, তরুণ উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা এবং আলেকজান্ডার সরলথ। তবে ম্যাচের যেকোনো কঠিন মুহূর্তে বা আক্রমণভাগের শেষ ফিনিশিংয়ে হালান্ডই এই মুহূর্তে পুরো দলের প্রধান ভরসা ও ত্রাতা।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠে এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। ডাগআউটের সবাইকে জড়িয়ে ধরে উদযাপনের পর হালান্ড মাঠের গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার নরওয়েজীয় সমর্থকদের সামনে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ (Viking Roar) স্লোগান ও উল্লাসের নেতৃত্ব দেন। ক্যামেরায় বন্দি হওয়া এই দৃশ্যটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, যা তাঁর মাঠের ভেতরের দুর্দান্ত নেতৃত্বগুণের অনন্য প্রতিফলন বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা।

অবশ্য বিশ্বকাপের অগ্রযাত্রা এখন নরওয়ের সামনে আরও কঠিন ও অগ্নিপরীক্ষা হাজির করেছে। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং সম্ভাব্য ফাইনালের শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চের দিকে যতই দিন এগোবে, প্রতিটি ম্যাচেই পাল্লা দিয়ে বাড়বে মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তবে হালান্ডের বর্তমান রুদ্ররূপ ও অতিমানবীয় ফর্মের দিকে তাকিয়ে এবারের বিশ্বকাপে যেকোনো অঘটন ঘটাতে আশাবাদী পুরো নরওয়ে শিবির।

যদি শেষ পর্যন্ত সব বাধা টপকে নরওয়ে ফুটবল দল তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, তবে সেটি শুধু নরওয়ের জন্য প্রথম সোনালী ট্রফিই হবে না, বরং তা হবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক বাবার অপূর্ণ ও অসমাপ্ত বিশ্বকাপ স্বপ্ন ছেলের হাতে পরম পূর্ণতা পাওয়ার এক অমর ও ঐতিহাসিক অধ্যায়।

মন্তব্য করুন