গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করব: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ণ
গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করব: শফিকুর রহমান
অনলাইন ডেস্ক ঃ গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারকে চূড়ান্তভাবে বাধ্য করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের এই জাতীয় দাবি থেকে তাঁরা এক চুল পরিমাণও পেছনে সরবেন না।

আজ শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চার দফা দাবিতে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন অবিলম্বে বন্ধ এবং তীব্র জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদেরকে বিভিন্ন কৌশল ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণভোট বাস্তবায়নের মূল দাবি থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য চারদিক থেকে অনেক ধরনের কথা বলা হচ্ছে। আমি পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই—আমরা কোনো অবস্থাতেই জাতির সাথে বেইমানি করতে পারবো না। জাতিকে আমরা যে কথা দিয়েছি, সেই লড়াই আমরা রাজপথে শেষ পর্যন্ত করে যাবো। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এই সরকারকে বাধ্য করবো ইনশাআল্লাহ। এর থেকে এক চুল পরিমাণও আমরা সরবো না। শহীদ আবু সাঈদের রক্তে ভেজা এই রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ আমি আরেকবার এই দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে গেলাম।”

তিনি আরও বলেন, যে বৈষম্য সম্পূর্ণ দূর করে বাংলাদেশের পচা ও নোংরা রাজনীতিকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের সন্তানেরা জীবন দিয়ে লড়াই করেছিল, সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যই মূলত সংস্কারের উদ্দেশ্যে দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজে জনসভায় বলেছিলেন—আপনারা ভোট দেবেন দুটো; একটি আমার দলকে এবং আরেকটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক বাক্সে। তিনি নিজের প্রথম কথাটি ঠিকই রক্ষা করেছেন, কিন্তু জনগণের দ্বিতীয় অধিকারটি তিনি আর রক্ষা করেন নাই।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও রংপুর প্রসঙ্গ

তিস্তা নদী ও উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “তিস্তা নদী নিয়ে বর্তমান সরকারি দল নির্বাচনের আগে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও’—এই স্লোগান দিয়ে বড় বড় আন্দোলন করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তিস্তা নিয়ে এবারের রাষ্ট্রীয় বাজেটে মাত্র ১০ টাকারও কোনো অ্যালোকেশন বা বরাদ্দ রাখা হয়নি। আমরা আর সরকারের মুখের কথার ফুলঝুরি শুনতে চাই না; আমরা এখন মাঠপর্যায়ে বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। এই সরকার যদি দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে আগামীতে আপনাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, দোয়া, ভালোবাসা ও সমর্থনে ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই ১১ দলীয় ঐক্যই সরকার গঠন করবে এবং আপনাদের সব দাবি বাস্তবায়ন করবে ইনশাআল্লাহ।”

রংপুরকে ‘কৃষি রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আমরা আগে বলেছিলাম—আমরা যদি ভবিষ্যতে নির্বাচিত হতে পারি এবং মহান আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদের সুযোগ দেন, তবে আমরা এই রংপুর বিভাগকে দেশের ‘কৃষির রাজধানী’ হিসেবে ঘোষণা ও রূপান্তর করবো। সেই কৃষি রাজধানীর কথা এখন বর্তমান সরকারও সংসদে অনুকরণ করে বলছে। কিন্তু রাজধানীকে শুধু মুখে মুখে ভিক্ষা দিলে রাজধানী বনবে না, রাজধানীকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা করতে হবে। এখানে এসে শুনতে পেলাম অত্যন্ত দুঃখের বিষয়—কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে ফসল ফলায়, এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়। অথচ এখন হিমাগারে আলু রাখতে গেলে বস্তা প্রতি ৬০০ টাকা করে কৃষকদের দিতে হচ্ছে। এটি চরম অন্যায়। সরকারি উদ্যোগে ন্যায্য দামে সেখানে আলু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।”

সীমান্ত উত্তেজনা ও সার্বভৌমত্ব

সীমান্তে চলমান উত্তেজনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াতের আমির বলেন, “আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে যে সীমান্ত রয়েছে, সেই সীমান্তে প্রতিনিয়ত সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। অথচ এই সরকার ভীরুর মতো মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে আছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি, দেশের জনগণও প্রতিবাদ করছে। শুধু প্রতিবাদই করছে না, সীমান্তে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির (BGB) বীর সৈনিকদের সাথে সমানতালে দেশের সাধারণ জনগণও লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এই সংগ্রামী বীর জনতাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। অথচ এই মেরুদণ্ডহীন সরকারের মুখ থেকে এই ব্যাপারে এখন পর্যন্ত একটা শব্দও আসে নাই। কার ভয়ে, কাকে খুশি করার জন্য আপনারা চুপ করে আছেন? আপনারা কোন দেশের শাসক? মেহেরবানি করে বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির পালস বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কী ভয়াবহ পরিণতি হয়—তা সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে সবারই খুব ভালো করে সবক বা শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।”

দেশের সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “এই দেশ আমাদের সবার। আল্লাহই এই দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা। আমরা যতদিন বেঁচে থাকবো, দেশের এক ইঞ্চি জমিতো দূরের কথা, একটা বালুকণার ওপরেও বাইরের কাউকে কোনো ধরনের কর্তৃত্ব করতে দেবো না। যারা আমাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, তাদেরকে বলি—আপনারা এইভাবে বাংলাদেশকে দুর্বল বিবেচনা করবেন না। আমাদের বর্ষীয়ান নেতা ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম যথার্থই বলেছেন—আমাদের নিয়মিত সৈন্য কেবল দুই লাখ বা আড়াই লাখ নয়; এই স্বাধীন দেশে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটা নারী ও পুরুষই একেকজন বীর সৈন্য। বিগত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে দেশের আপামর জনগণ দলমত নির্বিশেষে রাজপথে নেমে এটার প্রমাণ হাতেনাতে রেখেছে।”

দ্রব্যমূল্য ও দুর্নীতি

দেশের বর্তমান দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি এবং দুর্নীতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যে দেশের সাধারণ জনগণ আজ চরম অস্থির ও দিশেহারা। কিন্তু এই জনদুর্ভোগের চিত্র সরকারের হৃদয়ে একটুও ঢোকে না। এ দেশের সাধারণ জনগণ তো কোনো চাঁদাবাজি করে না, তাদের তো কোনো অবৈধ অর্থের উৎস নেই, তারা তো কোনো ঘুষ-দুর্নীতির সাথেও সম্পৃক্ত নয়। তাহলে তাদের এই কষ্টের দুঃখ ওইসব লোকেরা কেমনে বুঝবে—যারা নিজেরা প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজিতে লিপ্ত এবং যারা দিনরাত ঘুষ ও দুর্নীতিতে ব্যস্ত! তারা সাধারণ মানুষের এই কষ্ট কখনোই বুঝবে না।”

তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, “অতীতের সব দুর্নীতিবাজরা এক হয়ে পর্দার আড়ালে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের কয়েকবার নির্বাচনে হারিয়ে দিয়েছে। তবে আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই—ঘুঘু তুমি ধান খেয়েছ বারবার, এবার ধরা পড়বে একবার। আগামীতে এই ধরনের কারচুপির সুযোগ দেশের সচেতন জনগণ আর কাউকেই দেবে না। তখন দেশে সম্পূর্ণ ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তির ওপরে এই ১১ দল একটি জনবান্ধব সরকার গঠন করবে ইনশাল্লাহ। যে দেশে চাঁদাবাজ তো দূরের কথা, তাদের ছায়াও রাষ্ট্র বরদাশত করবে না। দুর্নীতি করার প্রয়োজনই কারও হবে না, সম্মানজনকভাবে সবাই বাঁচতে পারবে। এরপরেও যদি কেউ লোভের বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো দুর্নীতি করে, তবে তাকে কোনোভাবেই ছেড়ে কথা বলা হবে না—তিনি যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন, তাঁকেও আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।”

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, রংপুরের বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার নেতাকর্মী, শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ জনতা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন