মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারীদের ক্ষমা চাইতে হবে: মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী
মন্ত্রী বলেছেন, “আমি স্পষ্ট করে বলব, ’৭১–এ যাঁদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, যাঁরা ’৭১–এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের উদ্যোগেই এগিয়ে আসতে হবে। জাতির কাছে তাঁদের এই ঐতিহাসিক ভুলটাকে অকপটে স্বীকার করতে হবে এবং বিনম্রচিত্তে জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে হবে।”
আজ শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া (RAOWA) কনভেনশন হলে ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট—ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) এই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
দেশে টেকসই জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের সর্বস্তরের মানুষ একটি সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য চান। তবে মহান মুক্তিযুদ্ধে কারোর বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকার বিষয়টি সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া সহজ বা সম্ভব নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তি বা দলগুলোকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, “সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য, একই সুতোয় গাঁথার জন্য, তাঁরা যেন হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে লালন করেন এবং চেতনায় নতুন ও বৈষম্যহীন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ধারণ করেন; একই সাথে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বাংলাদেশকে লালন ও ধারণ করেন—এটাই মূলত আমার মূল কথা।” সবার সম্মিলিত ও কার্যকর অবদানে বাংলাদেশ আগামী দিনে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালনকালে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় প্রাণ হারানো দেশের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর বীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়েও জোরালো কথা বলেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী। তিনি বলেন, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অক্ষুণ্ণ ও রক্ষা করতে গিয়ে যাঁরা নিজেদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের সেই সর্বোচ্চ অবদানও রাষ্ট্রের যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।
এই প্রসঙ্গে আহমেদ আযম খান আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যেভাবে খেতাবপ্রাপ্ত ও সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত সম্মাননা ও ভাতা দিয়ে থাকে; ঠিক একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দেওয়া বা বিশেষ অনন্য অবদান রাখা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কোনো ধরনের বিশেষ রাষ্ট্রীয় খেতাব বা সম্মাননা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে তাঁর মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করবে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এখানে টাকাটা কোনো বড় কথা নয়, রাষ্ট্র কর্তৃক সম্মানটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।”
মহান মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধরে আহমেদ আযম খান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে বিভিন্ন বাহিনী এবং বিশেষ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। সামরিক ইতিহাসের এই অনন্য বীরত্বগাথা ও ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পুনর্গঠিত হওয়া আমাদের বর্তমান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পেশাদারত্বকে আন্তর্জাতিক মানে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই তিন বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিতে আরও শক্তিশালী ও চৌকস করা প্রয়োজন।
উক্ত আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত কবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষানবিস শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।
|