তৃণমূলে বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবে সরকার

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ
তৃণমূলে বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবে সরকার
তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। (প্রতীকী ছবি)

জাতীয় ডেস্কদেশের সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতকে সম্পূর্ণ নতুন করে ঢেলে সাজানোর বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা সহজে পৌঁছে দিতে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাজনিত ভোগান্তি কমাতে রাজধানীসহ বড় বড় শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য গ্রামের মানুষকে আর কষ্ট করে শহরমুখী হতে হবে না; বরং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই আধুনিক চিকিৎসার সব প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে তোলা হবে বিশেষায়িত ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাবেন। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সুবিধাসহ ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগ, ইনডোর ও আউটডোর সেবা এবং আধুনিক প্যাথলজি সুবিধা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জোরালো করতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একজন নারী ও একজন পুরুষ ফিজিওথেরাপিস্টের নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে। জেলা হাসপাতালগুলোতেও ক্যান্সার ও কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তৃণমূলের মানুষের কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াকে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ঘরে ঘরে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (হেলথ স্ক্রিনিং) কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও জানান, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মূলত যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি)’ মডেলের আদলে প্রতিটি ইউনিয়নে এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ইউনিটের অধীনে তিনটি করে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক থাকবে এবং প্রতিটিতে দায়িত্ব পালন করবেন তিনজন করে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার।

এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.১ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতের সরকারি বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।

চিকিৎসাব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করতে সরকার দেশের প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে ‘ইলেকট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তের হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসক মুহূর্তেই রোগীর আগের চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধসংক্রান্ত যাবতীয় ডাটা দেখতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী—এই পাঁচ জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ কার্ড বিতরণের জন্য ১৬২ কোটি টাকার একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের এই মহাযজ্ঞ সফল করতে শিগগিরই ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে দেশে ২৫ হাজার নতুন মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ফলে প্রতি ইউনিয়নে অন্তত দুজন করে মিডওয়াইফ স্বাভাবিক প্রসবসহ মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। তিনি আরও জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত করতে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে ২০০ শয্যার পাঁচটি আধুনিক ও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে। প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে।

সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "স্বাস্থ্যসেবায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসাকাঠামো আরও শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার কেন্দ্রে রূপান্তর করা গেলে দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।"

মন্তব্য করুন