ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: ২০ ঘণ্টার চেষ্টায় বাবাকে বাঁচালেন ছেলে

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ণ
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: ২০ ঘণ্টার চেষ্টায় বাবাকে বাঁচালেন ছেলে

আন্তর্জাতিক  ডেস্ক: ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরার উপকূলীয় শহর কারাবালেদার বাসিন্দা হোসে গার্সিয়ার কাছে গত ২৪ জুনের সন্ধ্যাটা ছিল আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। পেশায় গাড়ির মেকানিক ৪৬ বছর বয়সী হোসে স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে তাঁদের ‘রিতাসোল প্যালেস’ নামের ১১ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে পারিবারিক সময় কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে হঠাৎ প্রলয়ঙ্কারী ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পর আরও একটি তীব্র কম্পনে মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে পুরো ১১ তলা ভবনটি।

ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি থামার পর চোখ খুলেই হোসে বুঝতে পারেন, তিনি আর নিজের চেনা ফ্ল্যাটে নেই। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর কংক্রিটের স্তূপ। তিনি আসলে ধসে পড়া ভবনের মাটির নিচের বেজমেন্টে জীবন্ত চাপা পড়ে আছেন। তাঁর ঠিক পাশেই আটকে আছে তাঁর দুই সন্তান—৭ বছর বয়সী দিয়েগো এবং ১২ বছরের সান্তিয়াগো। অন্ধকার সেই নরককূপের স্মৃতি চারণ করে হোসে বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের নিচে এমনভাবে আটকা পড়ার চেয়ে ভয়ংকর ও দমবন্ধ করা অভিজ্ঞতা এই পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।’

তবে মৃত্যুর সেই চরম মুহূর্তে অন্ধকারের বুক চিরে আসা একটি পরিচিত কণ্ঠ হোসেকে নতুন করে বাঁচার আশা দেয়। পরে জানা যায়, সেই উদ্ধারকারীদের অগ্রভাগে থাকা প্রধান বীরটি আর কেউ নন, তিনি হোসেরই নিজের বড় ছেলে, ২৬ বছর বয়সী জেসুস গার্সিয়া। চোখে আনন্দের জল নিয়ে হোসে বলেন, ‘সে-ই আমার বড় ছেলে জেসুস। ও-ই ছিল সেদিন আমাকে ও আমার দুই সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করা আসল বীর।’

জেসুস একসময় লা গুয়াইরা ফায়ার সার্ভিসে ফায়ার ফাইটার হিসেবে কাজ করতেন, তবে ভূমিকম্পের কিছু দিন আগেই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এক সাবেক সহকর্মী সম্ভাব্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে জেসুসের পুরোনো হেলমেট ও জ্যাকেটটি ফায়ার স্টেশনে সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। প্রকৃতির এই প্রলয়ঙ্কারী রাতে শহর ধসে পড়ার খবর শুনেই সেই পুরোনো সরঞ্জাম ও পোশাক পরেই উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন জেসুস।

নিজের চেনা রিতাসোল প্যালেস ভবনের সামনে পৌঁছেও জেসুস জানতেন না, তাঁর পরিবারের কেউ আদৌ জীবিত আছেন কি না। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ফায়ার সার্ভিসের এক সাবেক সহকর্মী তাঁকে আশার আলো দেখিয়ে বলেন, ‘জেসুস, তোমার বাবা দুই ছোট ভাইকে বুকে নিয়ে নিচে এখনও জীবিত আছেন!’ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পারলেও, কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপের একটি সরু গর্ত দিয়ে বাবার চেনা কণ্ঠ শুনতে পান জেসুস। হোসে নিচ থেকে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না।’ জেসুস তখন কান্না চেপে বাবাকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘বাবা, আমার ওপর ভরসা রাখুন। শান্ত থাকুন। বাচ্চাদেরও শান্ত রাখুন। আপনাদের উদ্ধার না করে আমি এই মাঠ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।’

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ততক্ষণে এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছিলেন হোসে। তিনি তাঁর ছোট ছেলেকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিলেন যাতে ওপরের কংক্রিট তার গায়ে না পড়ে। অপর ছেলে সান্তিয়াগো তাঁর পাশেই ভারী মরণফাঁদে চাপা পড়ে ছিল, যার শুধু একটি হাত ও পা দেখা যাচ্ছিল।

বাবা ও দুই ভাই জীবিত আছেন নিশ্চিত হওয়ার পরই মরিয়া হয়ে খালি হাতেই পাথর সরানো শুরু করেন জেসুস। কিন্তু রাতের আঁধারে ভারী কংক্রিট সরানো অসম্ভব ছিল। পরদিন ২৫ জুন সকালে পুলিশ ও বিশেষ উদ্ধারকারী দলের ভারী ক্রেন ও কাটার সরঞ্জাম পৌঁছানোর পর অভিযান নতুন গতি পায়। লা গুয়াইরা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও তাঁদের সাবেক সহকর্মীর বাবার জন্য জানপ্রাণ লড়িয়ে দেন। অবশেষে সবার সম্মিলিত ও হাড়ভাঙা প্রচেষ্টায় ২৫ জুন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে—অর্থাৎ ভূমিকম্পের দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা পর—ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয় হোসে ও তাঁর দুই ছেলেকে।

হোসে বলেন, এই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি ঈশ্বরের কাছে এবং আমার ছেলের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। শুধু আমি নই, আমার দুই সন্তানও যেন নতুন জীবন পেয়েছে।’

তবে এই অলৌকিক ও আনন্দময় উদ্ধারকাহিনির মাঝেও লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও নীরব বেদনা। হোসের প্রিয় স্ত্রী এখনও সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন। ভূমিকম্পের ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও এবং লাশের মিছিল দীর্ঘ হলেও আশা ছাড়েননি হোসে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার যেমন বিশ্বাস ছিল আমার ছেলে এসে আমাদের উদ্ধার করবে, তেমনি এখনো বিশ্বাস করি, ও ওঁর মাকেও খুঁজে বের করবে।’

ভেনেজুয়েলার তথ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৩৪২ জনে পৌঁছেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৮৫৬টি ভবন এবং সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে ১৯০টি বহুতল ভবন। বর্তমানে গৃহহীন ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ।

এখন দিনের বেশির ভাগ সময় ধসে পড়া রিতাসোল প্যালেসের পাশে একাকী কাটান হোসে। উদ্ধারকারীদের কাজ নীরবে দেখেন আর নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমাদের আবার সম্পূর্ণ শূন্য থেকে জীবন শুরু করতে হবে। কিন্তু এই বেঁচে থাকার মূল্য যে কত বড়, সেটা আমি আর আমার পরিবার ছাড়া কেউ বুঝবে না।’

মন্তব্য করুন