পারস্য উপসাগরে ভিএলসিসি সুপারট্যাংকারের ভাড়া পাঁচ লাখ ডলার ছাড়াল

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ণ
পারস্য উপসাগরে ভিএলসিসি সুপারট্যাংকারের ভাড়া পাঁচ লাখ ডলার ছাড়াল
পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী একটি ভিএলসিসি (অতি বৃহৎ) অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার।

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি নৌ-অবরোধের প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলের ট্যাংকারের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় ভিএলসিসি (অতি বৃহৎ) অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া বেড়ে গড়ে ৫ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

যুদ্ধকালীন ঝুঁকির মধ্যেও চড়া মুনাফা নিশ্চিত করতে অনেক জাহাজ মালিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই অঞ্চল থেকে পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে চীনে তেল পরিবহনে রাজি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন রুটে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের আয় বিগত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিনোকরের মালিকানাধীন ‘মঙ্গোলিয়া প্রসপারিটি’ নামের একটি ভিএলসিসি ট্যাংকার সম্প্রতি পারস্য উপসাগরের একটি গোপন বন্দর থেকে তেল পরিবহনের জন্য প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

গত এপ্রিলে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। দুই পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবরোধ জোরদার করার চেষ্টা চলায় সামরিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়ছে।

বহুজাতিক সংস্থা জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, প্রণালি পার হওয়ার সময় ইরানি হামলায় সম্প্রতি একজন নাবিক নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ওমান উপসাগরে ইরানি বন্দরের দিকে যেতে চাওয়া পানামার পতাকাবাহী একটি কন্টেইনার জাহাজে মার্কিন বাহিনী গুলি চালিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, প্রণালিটি এখনো উন্মুক্ত রয়েছে এবং গণমাধ্যমের খবরের চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এটি অতিক্রম করছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার কারণে খালি জাহাজের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

শিপিং খাতের এই চরম অনিশ্চয়তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় মুনাফার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ক্রুড অয়েল ফ্রেইট ফিউচার্সে বিনিয়োগকারী ফাণ্ড ‘ব্রেকওয়েভ ট্যাংকার শিপিং ইটিএফ’-এর শেয়ারমূল্য চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার দুই শত শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে সংঘাত আরও ঘনীভূত হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পক্ষেই বাজি ধরছেন।

অন্যদিকে, ইয়ামেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে পুনরায় হামলা শুরু করায় বিকল্প পথ হিসেবে বাব আল-মানদেবে জাহাজ চলাচলও চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে তেল পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, যেখান থেকে জাহাজগুলো আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করছে। স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ দীর্ঘ এই সমুদ্রপথের কারণে খালি জাহাজের ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠে ভাড়ার হার বাড়াচ্ছে।

এমন বৈরী পরিবেশ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে নিজেদের প্রাধান্য ধরে রাখতে ঝুঁকি নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি সম্প্রতি দৈনিক রেকর্ড ৪১ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে। বৈশ্বিক এই সংকটের সুযোগ নিতে তাদের অনেক ট্যাংকার অবস্থানের তথ্য জানানো ট্র্যাকিং সিগন্যাল বন্ধ রেখে গোপনে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে।

মন্তব্য করুন