
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জলাতঙ্ক (রেবিস) রোগের ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় এবং স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতেও টিকার সহজলভ্যতা না থাকায় চরম আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন জেলার সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা সরকারি হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। আক্রান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলেও সিরাজগঞ্জে বর্তমানে সেই সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো বহু রোগী কামড় বা আঁচড়ের চিকিৎসা নিতে আসছেন, কিন্তু ভ্যাকসিনের মজুদ না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা বাইরে থেকে চড়া দামে কিনে আনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, জেলার ৯টি উপজেলার কোনো ফার্মেসিতেই বর্তমানে এই জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কামড়ের ধরন ও সময় অনুযায়ী চিকিৎসকরা বিভিন্ন কোম্পানির ভ্যাকসিনের নাম লিখে দিলেও বাজার থেকে তা সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণ সময়ে একটি ভ্যাকসিনের দাম ৫০০ টাকার আশেপাশে থাকলেও বর্তমানে ১ হাজার টাকা দিয়েও তা মিলছে না। সদর উপজেলার বাগবাটি থেকে আসা রোগীর স্বজন মাসুদ জানান, হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে তিনি অনেক কষ্টে ঢাকা থেকে টিকা আনিয়ে রোগীর জীবন রক্ষা করেছেন।
কাজিপুর থেকে আসা রবিন নামে এক ব্যক্তি জানান, তার ছেলেকে কুকুরে আঁচড় দেওয়ার পর স্থানীয় হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল কোথাও ভ্যাকসিন পাননি এবং ফার্মেসিতেও সরবরাহ নেই। শহরের হোসেনপুর এলাকার বাসিন্দা মোমেনা জানান, তার মেয়েকে বিড়াল আঁচড়ানোর পর অনেক খোঁজাখুঁজি করে দ্বিগুণ দামে ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের উপদ্রব বাড়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ ডোজ ভ্যাকসিনের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১৪ ডিসেম্বর থেকেই ভ্যাকসিনের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন প্রদানকারী নার্স আয়েশা জানান, প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভিড় করলেও তাদের সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগে রোগীরা বাইরে থেকে কিনে আনলে তারা পুশ করে দিতেন, কিন্তু এখন বাইরেও সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা ভ্যাকসিন স্টোর কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, এক মাস আগে প্রাপ্ত ৫০০ ডোজ ভ্যাকসিন ৯টি উপজেলায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য ছিল। ওষুধ বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কোম্পানির পক্ষ থেকেই সরবরাহ বন্ধ রয়েছে; মূলত কাঁচামাল সংকটের কারণে এই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকিকুন নাহার বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে এবং প্রতিটি উপজেলার জন্য আলাদা চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এই সংকট সমাধানের আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
আর.এম/সকালবেলা