
সাঈদ পান্থ, বরিশাল: বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলের নদীগুলোতে যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মান্তা সম্প্রদায়ের নারীরা চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে মৎস্য আহরণ ও এই পেশার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও এখনো মান্তা জেলে নারীদের নিজস্ব কোনো ভূমি নেই। মেলেনি সামাজিক স্বীকৃতি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় সেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। এমনকি ভূমিহীন এই যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যুর পর কবরের জন্য এক টুকরো জমিও নেই। মান্তা জেলে নারীদের এই জীবনসংগ্রাম, অধিকার বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মান্তা সম্প্রদায়ের নারীরা বংশপরম্পরায় নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরা, জাল তৈরি, মাছ শুকানো ও বাজারজাতকরণসহ মৎস্য নির্ভর জীবিকার নানা কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। কিন্তু মাছ ধরার মতো কঠোর পরিশ্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের শ্রমের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাগত স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই নারীদের অবদান প্রায় উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এর ফলে তারা শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং দুর্যোগকালীন জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা পেশাগত নিবন্ধনের অভাবে সরকারি অনেক সুবিধাই তাদের কাছে পৌঁছায় না।
সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রাশেদ খান বলেন, মান্তা জেলে নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে আমরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তারা যেন ভিজিএফ, ভিজিডি কার্ড, বিধবা ভাতা বা দুর্যোগকালীন ত্রাণের মতো সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আসতে পারে, সেই দাবি জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি মাছ ধরার ওপর মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের জীবিকা স্থবির হয়ে পড়ে, তাই তারা বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন। রিপোর্ট একাত্তর ডটকমের হেড অফ করেসপন্ডেন্ট সাইদুর রহমান পান্থ জানান, ইতিপূর্বে মান্তা নারীদের মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতির অভাব ছিল। তবে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে অধিকাংশের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দেওয়া হয়েছে এবং জেলে কার্ডের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।
চন্দ্রদীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক শামিয়া আলী জানান, মান্তা জেলে নারীদের অধিকার সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড ও আর্টিকেল ১৯ এর সহযোগিতায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটিসহ তিনটি সংস্থা যৌথভাবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানজুরা মুশাররফ এই বিষয়ে জানান, মান্তা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রশাসন সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা খুব দ্রুতই সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আর.এম/সকালবেলা