
তবিবুর রহমান: বাংলাদেশে বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো আরও একটি নতুন ভাইরাস শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। ‘রিওভাইরাস’ (অর্থোরিওভাইরাস) নামের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষের তীব্র শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত (এনকেফালাইটিস) জটিলতা দেখা দেয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের আইইডিসিআর-এর যৌথ গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ইতোমধ্যে পাঁচজনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
গবেষণার তথ্য ও প্রযুক্তি:
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকী ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস-এ প্রকাশিত এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. নিশয় মিশ্র। গবেষণায় রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ভিরক্যাপসেক-ভার্ট’ প্রযুক্তি, যা প্রচলিত পিসিআর পরীক্ষার চেয়েও অনেক বেশি সংবেদনশীল। বাংলাদেশে এই প্রথম বাদুড়-উৎপত্তিজনিত ‘রিও ভিরিডি’ গোত্রীয় ভাইরাসে মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলল।
লক্ষণ ও সংক্রমণের উৎস:
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রোগীরা ২০২২ ও ২০২৩ সালে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাদের উপসর্গ ছিল অনেকটা নিপাহ ভাইরাসের মতো—জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক জটিলতা। তবে পরীক্ষায় তাদের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
গবেষকরা জানান, আক্রান্ত পাঁচজনই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। শীত মৌসুমে বাদুড়ের প্রিয় খাবার এই কাঁচা রস থেকেই নিপাহর মতো রিওভাইরাসও ছড়াচ্ছে। গবেষণায় পদ্মা নদীর অববাহিকার বাদুড় এবং ওই এলাকার মানুষের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য:
আইইডিসিআরের পরিচালক ড. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘‘নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে আসা প্রায় ১৩০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৫ জনের শরীরে রিওভাইরাস পাওয়া গেছে। এটি নিয়মিত রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু শনাক্তকরণ গবেষণার অংশ।’’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, ‘‘রিওভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসায় নিপাহ ভাইরাসের মতোই নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসাই একমাত্র ভরসা। মস্তিষ্কে প্রদাহ হলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে।’’
আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক ড. শারমিন সুলতানা পরামর্শ দেন, ‘‘বাদুড় মানুষের খাবারের সংস্পর্শে আসছে। তাই কাঁচা খেজুরের রস এবং আংশিক খাওয়া বা পোকায় কাটা ফল খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।’’
এম.এম/সকালবেলা