
মাঠ
পর্যায়ের জরিপ ও সাধারণ ভোটারদের
ভাষ্যমতে, বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থী নির্বাচনে থাকলে বিএনপির প্রার্থী মাজহারুল আলমের পরাজয় ছিল প্রায় সুনিশ্চিত। অভিযোগ উঠেছে, ভোটের মাঠে লড়াই করে জেতা কঠিন হবে জেনে, প্রশাসনিক কারসাজি, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তুচ্ছ অজুহাতে শক্তিশালী প্রার্থীদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মামলার ভয় ও ভোটারদের পলায়ন: ভুক্তভোগী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ১ শতাংশ ভোটারের
সমর্থন যাচাইয়ের নামে প্রশাসন ও একটি বিশেষ
মহল ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছে এবং মামলার ভয় দেখিয়েছে। ফলে ভয়ে ভোটাররা সমর্থন অস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।
‘‘দৈনিক
সকালবেলা’র সঙ্গে একান্ত
ফোনালাপে এসব ক্ষোভ ও অভিযোগ তুলে
ধরেন সদ্য মনোনয়ন বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম চুন্নু। তিনি বলেন,
‘‘রিটার্নিং অফিসার আমাকে কোনো সার্টিফাইড কপি দেননি। আমার ভোটার
তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদের খুঁজে বের করে বলা হয়েছে—‘তোমাদের নামে মামলা আছে, অ্যারেস্ট করবে’। এই ভয়ে
তারা পিছন দরজা দিয়ে পালিয়েছে।’’
তিনি
আরও অভিযোগ করেন, কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিলে বিপদ হবে—এমন ভয় দেখানোর কারণে ভোটাররা সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনের কেউ কেউ বায়াসড (পক্ষপাতদুষ্ট) হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘আমি আপিল করেছি, আশা করি আপিল কমিশনে আমার মনোনয়ন ফিরে পাব।’’
বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি: একই সুরে অভিযোগ করেছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল। তিনি বলেন, ‘‘ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খোঁজা হয়েছে এবং তাদের অজান্তে হোক বা জেনেই হোক, বলা হয়েছে যে তোমাদের নামে মামলা হয়েছে। যাতে ভোটাররা তাড়াতাড়ি আসে বা ভয় পায়। তখন ভোটাররা ডরাইয়া (ভয় পেয়ে) এগুলি অস্বীকার করছে।’’
তিনি
এটাকে মনোনয়ন বাতিল করার একটি ‘প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘‘এর সাথে কারা জড়িত জানি না, তবে ষড়যন্ত্র তো অবশ্যই আছে। খুব সামান্য যুক্তিতে এটা বাতিল করা হয়েছে।’’
‘কালো আইন’ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা: ১ শতাংশ ভোটারের
স্বাক্ষরের বিধানকে ‘কালো আইন’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রুহুল হোসাইন। তিনি বলেন, ‘‘একজন সুস্থ স্বাভাবিক নাগরিকের নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার থাকা উচিত। ১ শতাংশের এই
বিধান মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সময়ের কালো আইন, যা রাজনীতিকে রাজনীতিশূন্য করার জন্য করা হয়েছিল।’’
ক্ষোভ
প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘ভোটের আগেই যদি আমার সমর্থনকারী প্রকাশ্যে চলে আসে, তবে ভোটের গোপনীয়তা থাকে না। আমাকে কে ভোট দেবে, তা আমি যাকে খুশি তাকে দেব। ১ শতাংশের এই
বিষয়টি ফেরেশতাও ঠিক করতে পারবে না।’’ তিনি আরও বলেন, এই বাতিলের পেছনে অবশ্যই কোনো পক্ষপাতিত্ব বা চক্রান্ত রয়েছে, যা দলের ‘লেজুড়বৃত্তি’ করার জন্য করা হচ্ছে।
‘তুচ্ছ
কারণে’ খেলাফত মজলিস প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল: স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাশাপাশি ‘তুচ্ছ কারণে’ মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হেদায়েতুল্লাহ হাদী (রিকশা প্রতীক)। তিনি ‘দৈনিক
সকালবেলা’কে জানান, তার আইনজীবী মোট ৮ জন প্রার্থীর
ফরম পূরণ করেছিলেন, যার মধ্যে ৭টিই গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু রহস্যজনকভাবে শুধু তার ফরমটিই বাতিল করা হয়েছে।
হেদায়েতুল্লাহ
হাদী বলেন, ‘‘আমার আইনজীবী ৮ জন সংসদ
সদস্য প্রার্থীর ফরম পূরণ করেছেন, ৭টাই গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু আমারটাই রিজেক্ট করেছে। এখানে মূলত ২১ নম্বর একটা ফরম, যেটা আয়-ব্যয়ের বিবরণী। যেহেতু আমার আয়-ব্যয়ের বিবরণী বা ট্যাক্স রিটার্ন আমি দাখিল করেছি এবং সব সবিস্তারে দেওয়া আছে, তাই আলাদা করে ওই ফরমটা পূরণ করিনি। এটা পূরণ করার প্রয়োজন নেই। অথচ এটাকে ইস্যু করে আমাকে বাতিল করা হলো’’।
তিনি
আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রতিবাদ জানালে তারা অপারগতা প্রকাশ করেন। রিটার্নিং অফিসের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘তারা আমাকে বলেছে, ‘আপনারটা যদি এখন ফেরত দেই (বৈধ করি), তাহলে আরও চার-পাঁচজন আছে যারা এসে ধরবে। তখন আমরা কুলাতে পারবো না’। কোনো জটিলতা
থাকলে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে বলা হয়েছে, তারা নাকি সেখান থেকে ফেরত দেবেন’’।
শেষ ভরসা আপিল: প্রশাসনিক জটিলতা, তুচ্ছ অজুহাত ও চক্রান্তের শিকার
হওয়ার দাবি করলেও বাতিল হওয়া প্রার্থীরা উচ্চ আদালতে বা নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। তারা আশাবাদী, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। তবে সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন—আপিল করে কি তারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন, নাকি চক্রান্তের জালে আটকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে মাজহারুল
আলমের জন্য একপেশে নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হবে?
এম.এম/সকালবেলা