
কুয়াশা মোড়া অলস সকাল, দূরে সাইকেলে চড়ে যাওয়া কোনো পথিকের গলায় জড়ানো মাফলার, আর নানি-দাদির হাতের গরম পিঠার সুবাস— এই তো আমাদের বাংলাদেশের শীত। কারও কাছে শীত মানে পরীক্ষার শেষে দীর্ঘ এক ছুটি, আর কারও কাছে উৎসবের আমেজ। ব্যস্ত শহর থেকে নিভৃত গ্রাম, শীত আসার সাথে সাথেই পুরো দেশ যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। আমাদের এই রূপসী বাংলায় শীত কেবল একটি ঋতু নয়; এটি আনন্দ, উদযাপন আর উষ্ণতার এক মেলবন্ধন।
বাংলাদেশে শীত আর পিঠা যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে যখন মা-চাচিরা পরম মমতায় চুলায় ভাপা পিঠার হাঁড়ি বসান, সেই ঘ্রাণে পুরো বাড়ি মউ মউ করে।
আমাদের দেশে পিঠার কতই না বৈচিত্র্য! পাটিসাপটা, পুলি, চিতই, দুধ চিতই, মুরগ সমুচা, কিংবা তেলের পিঠা— প্রতিটি পিঠার আছে আলাদা স্বাদ আর আলাদা গল্প। গ্রামে এখনো 'পিঠা উৎসব' এক আনন্দের ঐতিহ্য। উঠোনে আগুন জ্বালিয়ে চারপাশ ঘিরে বসে পিঠা খাওয়া, হাসি-ঠাট্টা আর রাতভর গল্পের সেই উষ্ণতায় শীতের তীব্রতা যেন নিমেষেই উবে যায়।
এখন এই পিঠা উৎসব আর কেবল গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। শহরের অলিগলিতে, রাস্তার মোড়ে কিংবা উদ্যোক্তাদের আয়োজনে এখন পিঠা মেলার ধুম পড়ে। রসিক বাঙালি তাই মজা করে বলেই ফেলে— "বাংলার শীত হোক না ঠান্ডা, ভাপা পিঠার হাঁড়ি তো সবসময়ই গরম!"
বাঙালির কাছে শীত মানেই বিয়ের মৌসুম। চারদিকে রঙিন প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা আর উচ্চস্বরে গানের শব্দ জানান দেয় বিয়ের উৎসবের। গ্রামের খোলা মাঠ থেকে শহরের কমিউনিটি সেন্টার— সবখানেই এখন উৎসবের ছোঁয়া।
ঝকঝকে আলোর নিচে আত্মীয়-স্বজনদের মিলনমেলা, সাথে পোলাও আর খাসির মাংসের সুবাসে ম ম করা বাতাস— এই তো শীতের আমেজ। শহরের বিকেলগুলোও সাজ সাজ রবে মেতে ওঠে। দম্পতিদের ফটোশুট আর বাহারি সাজে বিয়ের উৎসবগুলো শীতের দিনগুলোকে করে তোলে আরও রঙিন ও স্মরণীয়।
বছরের অন্য ঋতুগুলোতে গরমে ফ্যাশন করাটা বেশ কঠিন। কিন্তু শীত আমাদের সেই সুযোগ দেয় দুহাত ভরে। ঘাম হওয়ার ভয় নেই, তাই ইচ্ছেমতো সাজগোজ করা যায়। শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবির ওপর বাহারি নকশার শাল, চামড়ার জ্যাকেট কিংবা স্টাইলিশ মাফলার— ফ্যাশন সচেতনদের জন্য শীত যেন আশীর্বাদ। এ সময় দেশি ফ্যাশন হাউজগুলোতেও দেখা যায় নতুন সব সংগ্রহের সমাহার।
শীত মানেই মেলা আর পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা। গ্রাম বাংলার উরস, পিঠা মেলা আর পাড়ার বার্ষিক বনভোজন এই সময়কার নিয়মিত চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতেও চলে নানা আয়োজন। টঙের দোকানে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা চলে ছেলেদের, মেয়েরা ব্যস্ত থাকে কেনাকাটায়, আর শিশুরা মেতে ওঠে ঘুড়ি কিংবা বেলুন নিয়ে।
ডিসেম্বর মানেই শিক্ষার্থীদের জন্য এক পরম স্বস্তির মাস। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় দাদু কিংবা নানু বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি। ভাই-বোনদের সাথে মেলামেশা, খেজুরের রস খাওয়া আর গভীর রাত পর্যন্ত গল্প করা— এই তো শৈশবের সেরা স্মৃতি।
প্রকৃতির সেরা উপহার হলো শীতের ভোরের সেই খেজুরের টাটকা রস। শীতের সকালে সেই কাঁচা রস খাওয়ার মজাই আলাদা। আর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি গুড় যখন পিঠার মিষ্টি স্বাদ বাড়িয়ে দেয়, তখন মনে হয়— শীতের এই সহজ-সরল রূপই আসলে বাংলার আসল সৌন্দর্য।