
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে ২৩টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় একটি বিলাসবহুল ক্রুজশিপ। যাত্রাটি আনন্দ ও উদ্যমের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও মাত্র পাঁচদিন পরেই তা রূপ নেয় বিষাদে। একজন ৭০ বছর বয়সী ডাচ যাত্রী প্রচণ্ড জ্বর ও তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মারা যান। এরপর ১১ এপ্রিল থেকে ২ মে’র মধ্যে জাহাজে আরও দুইজন যাত্রীর মৃত্যু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মে মাসের ২ তারিখে বিষয়টি অবহিত হয় এবং ল্যাব পরীক্ষার পর নিশ্চিত করে যে, সেই জাহাজে ভয়াবহ হান্টাভাইরাসের (Hantavirus) প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ১০ মে পর্যন্ত সেখানে ১০ জন আক্রান্ত এবং ৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন নৌ-দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে নতুন একটি স্বাস্থ্য ঝুঁকির বড় সতর্কবার্তা।
হান্টাভাইরাস কোনো একটি নির্দিষ্ট একক ভাইরাস নয়, বরং এটি একটি বড় ভাইরাস পরিবার বা ‘হান্টাভিরিডি’ (Hantaviridae)। এই পরিবারে অনেক প্রজাতি রয়েছে, যা মূলত ইঁদুর ও কাঠবিড়ালি জাতীয় (Rodent) প্রাণীর শরীরে বাস করে। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর ভিন্ন ধরনের হান্টাভাইরাস বহন করে এবং তা থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে হান্টাভাইরাস প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময়। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুদ্ধরত ৩ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, বমি এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো এক রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ সৈনিক মারা যান। চিকিৎসকরা একে ‘কোরিয়ান হেমোরেজিক ফিভার’ নাম দিলেও রোগটির আসল উৎস বুঝতে প্রায় ৩০ বছর সময় লেগে যায়। ১৯৮০ সালের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ভাইরোলজিস্ট ড. হো ওয়াং লি প্রথম শনাক্ত করেন, এই রোগটি ইঁদুর থেকে ছড়ানো একটি ভাইরাসের কারণে হয়। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ‘হান্টান’ (Hantan) নদীর নামানুসারে এর নাম রাখা হয় 'হান্টাভাইরাস'।
পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নাভাহো উপজাতির ১০ জন সুস্থ-সবল তরুণ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যান। প্রাথমিক মৃত্যুহার ছিল ৭৫ শতাংশ। রোগতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯১-৯২ সালের ‘এল নিনো’ (El Niño) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেখানে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এতে পাইন বাদামের ফলন বাড়ে, যা খেয়ে ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায় এবং ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
হান্টাভাইরাস মানবদেহে মূলত দুটি ভিন্ন ও মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে থাকে
‘হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম’। এটি মূলত এশিয়া ও ইউরোপে বেশি দেখা যায়। এতে রোগীর শরীরের ভেতরে রক্তপাত ঘটে এবং কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হন। ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’। এটি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় বেশি দেখা যায়। এই রোগে রোগীর ফুসফুসে তরল জমা হয়, যার ফলে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত রোগী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। এই সিনড্রোমে মৃত্যুর হার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
হান্টাভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো— ৭০ বছর ধরে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এফডিএ (FDA) বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত কোনো প্রতিষেধক ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাল চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসকরা কেবল উপশমকারী সহায়তামূলক চিকিৎসা (Supportive Care) দিতে পারেন। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকা সম্পূর্ণ নির্ভর করে রোগীর নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর।
দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল হান্টাভাইরাস কেবল ইঁদুর থেকে মানুষে ছড়ায়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে দক্ষিণ আর্জেন্টিনায় ‘আন্দেস ভাইরাস’ (Andes Virus) নামক হান্টাভাইরাসের একটি বিশেষ প্রজাতি মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে (Human-to-Human) ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয়। তবে আশার কথা হলো, এই ভাইরাস কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বাতাসে ভেসে (Airborne) ছড়ায় না। এটি ছড়ানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক, একই বিছানায় শোয়া বা রোগীর শারীরিক তরলের সংস্পর্শে আসতে হয়। এর সংক্রমণ উইন্ডো মাত্র এক দিনের। ফলে কোভিডের মতো ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজন পড়ে না।
দীর্ঘদিন ধারণা করা হতো ভারতীয় উপমহাদেশে হান্টাভাইরাস নেই। তবে ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোর জেলায় একটি গবেষণায় ২৮ জন হান্টাভাইরাস আক্রান্ত রোগী নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষিত মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ শতাংশের শরীরে হান্টাভাইরাসের অ্যান্টিবডি রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইঁদুর ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই ইঁদুরের উপদ্রব প্রবল। বিশেষ করে খাদ্যগুদাম, বস্তি, বন্যাকবলিত এলাকা এবং ড্রেনের আশেপাশে প্রচুর ইঁদুর বাস করে। প্রতি বছর বন্যার সময় মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণী ইঁদুরের সঙ্গে একই উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দেশের হাওর অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকাগুলো এই ভাইরাসের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা এবং লালার মাধ্যমে ছড়ায়। এগুলো শুকিয়ে যখন ধুলোর সঙ্গে মিশে যায়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাংলাদেশে হান্টাভাইরাস পরিস্থিতি নিরীক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো পদ্ধতিগত নজরদারি ব্যবস্থা (Systematic Surveillance) গড়ে না ওঠা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।
যেহেতু এই রোগের কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই একমাত্র উপায়
বাড়িতে ইঁদুর প্রবেশের সব ধরনের ফাঁক-ফোকর বন্ধ করতে হবে। পুরোনো বন্ধ ঘর বা গুদামঘর পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই এন-৯৫ (N-95) মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং ঘরবাড়ির বর্জ্য নিয়মিত ডাস্টবিনে অপসারণ করতে হবে। সরকারকে আইইডিসিআর (IEDCR)-এর অধীনে হান্টাভাইরাসকে তালিকাভুক্ত করে পৃথক নজরদারি কার্যক্রম (Surveillance) চালু করতে হবে। দেশব্যাপী বিশেষ করে শহরাঞ্চলে আধুনিক ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে এবং চিকিৎসকদের এই বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ২০২৬ সালের শক্তিশালী ‘এল নিনো’র পূর্বাভাসের কারণে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধির যে শঙ্কা রয়েছে, তা মোকাবেলায় ভারত ও মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও তথ্য আদান-প্রদান বাড়াতে হবে।
হান্টাভাইরাস এমন এক অদৃশ্য ঘাতক যা বিশ্বজুড়ে দশকের পর দশক ধরে নীরবে হানা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ক্রুজশিপের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই ভাইরাস কতটা দ্রুত সুস্থ মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে বাধ্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর বৈশ্বিক ঝুঁকি কম বললেও, ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এটিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এখনই যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে যেকোনো সময় এই নীরব ঘাতকের পদধ্বনি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।