তৃণমূল পুনর্গঠনে নজর দিচ্ছে বিএনপি

তৃণমূল পুনর্গঠনে নজর দিচ্ছে বিএনপি

জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাই এখন বিএনপি সরকারের মূল ফোকাস। এ লক্ষ্যে ১৮০ দিনের ‘স্বল্পমেয়াদি’ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে নতুন সরকার। এরই মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এই রমজানেই পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে আট বিভাগের আট উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড চালু হবে। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এবার সংগঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে বিএনপি।

নির্বাচনে ধানের শীষ না পেয়ে দলের নেতারা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় তৃণমূলের অনেক জায়গায় সংগঠন কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তৃণমূলে সংগঠন গুছিয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সংগঠন নিয়েই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় বিএনপি। সিদ্ধান্ত না হলেও এর অংশ হিসেবে ঈদুল ফিতরের পর তৃণমূল পুনর্গঠনে হাত দিতে পারে দলটি। তবে নির্বাচনে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া নেতাদের ব্যাপারে এখনই ভাবছে না বিএনপি। দলীয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপি নেতারা ধানের শীষ না পেয়ে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছিলেন তারা; যদিও বিষয়টি সহজেই উতরে এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তবে নির্বাচনে এত সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া নিয়ে চিন্তিত দল। তাই এর ‘প্রকৃত কারণ’ অনুসন্ধানে নামছে বিএনপি। দলটি বুঝতে চায়, ‘ধানের শীষ না পেয়ে দলের নেতারা কি নিজেদের অধিকতর যোগ্য মনে করে পাস করবে’—এই চিন্তা ও বিশ্বাস থেকেই ধানের শীষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিল, নাকি কারও ইন্ধনে প্রার্থী হয়েছিলেন?

বিএনপি এও মনে করছে, নির্বাচনে পাস করার প্রবল সম্ভাবনা ছিল, এ রকম বেশ কয়েকজন প্রার্থীও ফেল করেছেন। এদের মধ্যে খুলনা-২ আসনের নজরুল ইসলাম মঞ্জু, রংপুর-৬ আসনের সাইফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-১ আসনের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স অন্যতম। ধানের শীষের এমন প্রার্থীরা কেন ফেল করলেন, এর কারণও জানতে চায় দল। তাই এই দুটি বিষয় নিয়ে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের মাধ্যমে শিগগির কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপি।

তপশিল ঘোষণার পর প্রথমদিকে ধানের শীষ না পেয়ে ১১৭টি আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রায় ১৯০ জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে দলীয় নানান উদ্যোগের পর বেশিরভাগ নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলেও শেষ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিলেন বিদ্রোহীরা। বিএনপির দপ্তর বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর দলীয় বা দল সমর্থিত জোট প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি।

ভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ২০টির মতো আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থীরা সুবিধা পান। এ ছাড়া ৭টিতে জেতেন বিদ্রোহীরা। সব মিলিয়ে ২৭টির মতো আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রাখেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গত মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। সেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও নির্বাহী কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে রংপুর বিভাগের আসাদুল হাবিব দুলু, ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগের শামা ওবায়েদ, ময়মনসিংহ বিভাগের শরীফুল আলম এবং খুলনা বিভাগের অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রতিমন্ত্রী হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, একটি দলকে সাংগঠনিকভাবে গতিশীল রাখতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন; সংগঠনকে গতিশীল রাখতে তাদের স্থলে যত দ্রুত সম্ভব কর্মঠ, দলকে সময় দিতে পারবেন কিন্তু সরকারে নেই, এমন নেতাদের পদায়ন করা প্রয়োজন। দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি সবে সরকার গঠন করেছে। জনগণকে দেওয়া নানান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন বিএনপি সরকারের মূল ফোকাস। সুতরাং এই ব্যাপারটি নিয়ে দল এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি; যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে, দলের যারা এমপি-মন্ত্রী হবেন অর্থাৎ যারা সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন, তাদের পরিবর্তে দলের অন্য নেতাদের সংগঠনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রমজানে বিএনপির পক্ষ থেকে এবার কেন্দ্রীয়ভাবে দু-একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করা হতে পারে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই ইফতার পার্টিগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে পবিত্র রমজান উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল বস্তি এবং ভাসানটেক এলাকার ১৪টি এতিমখানা এবং হেফ্জ মাদ্রাসায় প্রত্যেককে পুরো রমজান মাসের জন্য ইফতার, রাতের খাবার ও সেহরি দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে প্রথম রোজায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান রাজধানীর পশ্চিম ভাসানটেক থানার অন্তর্গত জামিয়া কুরবানিয়া তালিমিয়া দাওরা হাদিস মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানার এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ইফতার করেন। ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে দলটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সায়েদুল আলম বাবুল বলেন, রমজানে স্বাভাবিকভাবেই ইফতার পার্টিগুলো হবে। যারা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তারা এলাকায় ইফতার পার্টি দেবেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীরাও সেখানে অংশগ্রহণ করবেন। এটাও এক ধরনের সাংগঠনিক কার্যকলাপ। 

তিনি বলেন, কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটা স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। কিছু কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে; আবার কিছু জায়গায় আহ্বায়ক কমিটি আছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। আমরা কিছুদিন পরে এগুলোতে হাত দেব। সরকারে বিএনপি থাকলেও বিএনপি যেহেতু একটা বৃহৎ সংগঠন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে, এটাতে কোনো ব্যত্যয় হবে না। তাছাড়া সামনে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো পর্যায়ক্রমে হতে থাকবে। সুতরাং দলকে গুছিয়ে সুসংগঠিত রাখতে হবে।

সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সাংগঠনিক সম্পাদক মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। দলে তাদের স্থলে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সায়েদুল আলম বাবুল বলেন, ‘এটা দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। হয়তো দল এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে দেখবে।’ বিএনপি ও সরকারের সফলতার জন্য উভয়ের মধ্যেই ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন বলে অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার গঠন করলেই দল পুনর্গঠন করতে হয়। কারণ, সরকার গঠনের সঙ্গে নতুন নতুন ডিমান্ড, নতুন নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিরোধী দলে বা সরকারের বাইরে থাকাকালীন দল একরকমভাবে পরিচালিত হয়, আবার সরকারে থাকলে দল আরেকরকমভাবে পরিচালিত হয়। এ জন্য দল পুনর্গঠন প্রয়োজন হয়। তবে পুনর্গঠন করতে গিয়ে যারা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের এখনই দলে নেওয়া সমীচীন হবে না। কারণ, নির্বাচনে ধানের শীষ ও দল সমর্থিত জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তারা দলকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছিলেন, যদিও দল এ জায়গা থেকে ওভারকাম করেছে।’

তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলে থাকলে তো সব ধরনের মানুষকেই পাশে রাখা যায়, তাতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু বিএনপি যেহেতু এখন সরকারে, তাই দল পুনর্গঠনে ত্যাগী-আন্তরিক নেতাদেরই সামনে নিয়ে আসতে হবে। দলের যারা যারা সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন, যারা দলে এখন আর ঠিকমতো রোল প্লে করতে পারবেন না; সংগঠনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে, সংগঠনকে গতিশীল করতে সেখানে অবশ্যই পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে পরের স্তরে যারা আছেন; যারা কর্মঠ, যারা দলকে সময় দিতে পারবেন কিন্তু সরকারে নেই, তাদের দলের কাজে লাগানো দরকার। তবে এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে—যতটা পারা যায় সরকারের প্রক্রিয়া থেকে দলের প্রক্রিয়াটা আলাদা রাখা। যারা দল থেকে সরকারে গেছেন, তাদের সবাইকে যদি দলে রাখা হয়, তাহলে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে দল এবং সরকার একাকার হয়ে যায়। দল এবং সরকারকে একাকার করে ফেলা যাবে না। আবার দলের যারা সরকারে আছেন, তাদের দল থেকে সম্পূর্ণ বের করেও দেওয়া যাবে না, তাহলে দলের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ-জবাবদিহি থাকে না।’ 

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘দল এবং সরকারের মধ্যে একটা ভারসাম্য লাগবে। সরকারে যারা আছেন, তারা যেন দলের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব, কর্তব্য ও আন্তরিকতা অনুভব করেন; অন্যদিকে দলে যারা আছেন, তারা যেন সরকারে থাকাদের এক ধরনের জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারেন। সরকারে বিএনপি এবং দলে বিএনপি—এই দুয়ের মধ্যে কানেকশন চ্যানেলটা থাকতে হবে। এটার ওপরই সরকার এবং দল উভয়ের সাফল্য নির্ভর করবে।’

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন