নাম ধরে ডাকে টিয়া, নাচে ময়ূর; নারায়ণগঞ্জের ছাদ-পার্কে দর্শনার্থীদের ঢল
জাতীয় ডেস্ক; শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততা, যানজটের ক্লান্তি আর কোলাহল পেরিয়ে বহুতল ভবনের ছাদে উঠতেই এক নিমিষে বদলে যায় পুরো পরিবেশ। চারপাশে দেশি-বিদেশি রঙিন পাখির কলকাকলি। খোলা বাতাসে স্বাচ্ছন্দ্যে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে বিরল প্রজাতির শত শত বিদেশি পাখি। সব মিলিয়ে মনে হবে, ধোঁয়া ও কংক্রিটের ইট-পাথরের শহরের বুকেই যেন গড়ে উঠেছে পাখির এক টুকরো সবুজ স্বর্গরাজ্য।
নারায়ণগঞ্জ সদরের টানবাজার পুকুরপাড় এলাকায় গড়ে উঠেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী ও নৈসর্গিক স্থান। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সারুমা বার্ড ব্রিডিং পার্ক’। শহরের কোলাহল ভুলে একটু প্রকৃতির স্বাদ নিতে প্রতিদিন পাখিপ্রেমীদের পাশাপাশি সাধারণ ভ্রমণপিপাসুদেরও আকৃষ্ট করছে ছাদের ওপর তৈরি এই পাখির রাজ্য।
শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ৮ হাজার বর্গফুট জায়গা জুড়ে পাশাপাশি থাকা পাঁচতলা ও ছয়তলা দুটি বাড়ির ছাদকে এক করে গড়ে তোলা হয়েছে এই পার্কটি। এখানে সংগৃহীত রয়েছে প্রায় ৫০ প্রজাতির ২০০ জোড়ারও বেশি দুষ্প্রাপ্য পাখি। পার্কে এলে দর্শনার্থীরা খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাও, আফ্রিকান গ্রে প্যারট, রেড-লোরেড অ্যামাজন প্যারট এবং রাজকীয় হার্লেকুইন ময়ূরসহ নানা প্রজাতির চোখধাঁধানো সৌখিন বিদেশি পাখি। পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি জাতের বিভিন্ন রঙিন মুরগিও।
তবে কেবল দুর্লভ পাখি সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ থাকেননি এই পার্কের তরুণ উদ্যোক্তা বজলুর রশিদ সেলিম; তিনি সফলভাবে দেশের মাটিতেই এসব প্রজননক্ষম উন্নত প্রজাতির পাখির ব্রিডিংও (প্রজনন) করাচ্ছেন।
এই পার্কটির অন্যতম সেরা আকর্ষণ হলো দৃষ্টিনন্দন ‘ম্যান্ডারিন ডাক’ (Mandarin Duck)। সমগ্র পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় হাঁসের প্রজাতিগুলোর একটি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত এই হাঁস সাধারণত চীন, জাপান ও কোরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। গাঢ় রঙের নান্দনিক বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে এর আলাদা কদর রয়েছে। ‘সারুমা বার্ড ব্রিডিং পার্কে’ বর্তমানে রয়েছে প্রায় ১৫ জোড়া দুর্লভ ম্যান্ডারিন হাঁস। পাশাপাশি উড ডাকসহ আরও নানা প্রজাতির বিরল জলচর পাখি ও হাঁস সানন্দে সাঁতার কাটছে কৃত্রিম জলাধারে।
শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে এমন স্নিগ্ধ পরিবেশ পেয়ে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ কাজের ফাঁকে ক্লান্তি কাটাতে, আবার কেউ পরিবার ও শিশুদের নিয়ে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটাতে ছুটে আসছেন। পাখিদের সুরেলী কিচিরমিচির, ময়ূরের রঙিন পেখম তুলে নাচ আর দূরন্ত পাখিদের ওড়াউড়ি—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে একদম ভিন্ন এক মেজাজ।
প্রতিবেশী পাঁচ বছরের শিশু মুয়াজ আনন্দ প্রকাশ করে বলে, "বাসায় আসায় আমার কাজই হলো পাখি দেখতে আসা। পাখি আমার ভীষণ ভালো লাগে। এখানে একটি পোষা টিয়া পাখি আছে, যেটা আমাকে সরাসরি নাম ধরে ডাকে!"
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী জয়দাস প্রীতম বলেন, "প্রকৃতি ভালোবাসে না এমন মানুষ কমই আছে। এই ব্যস্ত শহরে সময় কাটানোর মতো মনোরম জায়গা এমনিতেই কম। তাই ছাদের এই পরিবেশ মন ভালো করে দেয় বলে প্রায় প্রতিদিনই এখানে আসি।" নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী অসিমা তাসফিক বলেন, "অবসর পেলেই ছুটে আসি। প্রথমবার ছাদে উঠে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বাণিজ্যিক শহরে ছাদে এত বিশাল পরিবেশ সত্যিই আশা করা যায় না।"
পার্কটিতে ঘুরতে আসা আরেক দর্শনার্থী ফখরুল ইসলাম বলেন, "কেবল ব্যক্তিগত শখ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি এখন আর স্রেফ একটা পাখির খামার নয়। এটি নগর সৌন্দর্য, মানসিক সুস্থতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।"
ব্যতিক্রমী এই পার্কটির প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক বজলুর রশীদ সেলিম জানান, দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ধরে তিনি পরম মমতায় পাখি পালন করে আসছেন। ছাত্রজীবনে শখের বশে ছোট পরিসরে শুরু করা কাজটি কালের পরিক্রমায় আজকের বিশাল ‘সারুমা বার্ড ব্রিডিং পার্কে’ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, "পাখি পালন স্রেফ ব্যক্তিগত শখ বা বিনোদন নয়। ঠিকমতো সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি শিল্পে রূপ নিতে পারে। এ বিষয়ে বাণিজ্যিকভাবে এগোতে আমরা সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।"
ব্যস্ত শহরের ছাদে এভাবে পশুপাখি পালনের সৃজনশীল উদ্যোগকে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছে সরকারের স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান মিয়া বলেন, "যান্ত্রিক শহরের জীবনে পাখি মানুষের মানসিক স্বস্তি ও শান্তি বজায় রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখে। বৈজ্ঞানিক ও সঠিক নিয়মে লালন-পালন করা হলে ছাদের এই উদ্যোগগুলো দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিশাল ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে।"
নগরজীবনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি থেকে সাময়িক মানসিক প্রশান্তি খুঁজছেন যারা, তাদের জন্য নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই ছাদের পাখির পার্ক হতে পারে একদম অন্যরকম এক বিনোদন কেন্দ্র।
|