শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে স্পেন থেকে ফ্রান্স
অনলাইন ডেস্ক: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবনতি, শিক্ষকস্বল্পতা, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে তরুণ-তরুণী ও সাধারণ মানুষ। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি এবং আলবেনিয়াসহ একাধিক দেশে এই গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং কিছু স্থানে তা বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং তীব্র শিক্ষকস্বল্পতার প্রতিবাদে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন। শিক্ষকের অভাবে বহু শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্য নিয়ে জনঅসন্তোষ। হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন 'জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার' (সিজিটি) বিক্ষোভকারীদের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে নিত্যপণ্যের দাম কমানো, পেনশন ও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর জোরালো দাবি তুলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি সরকার তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিলেও রাজনৈতিক চাপ কমেনি। ২০২৭ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সরকারের ওপর এই আন্দোলন বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে স্পেনে গত সেপ্টেম্বর থেকেই আবাসনের আকাশচুম্বী মূল্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। ৮৭ বছর বয়সী এক নারীর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে তাকে উচ্ছেদ করার মর্মান্তিক ঘটনার পর এই আন্দোলন গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলগুলোর আবাসন কেনার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানান। পরিস্থিতি সামাল দিতে সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জরুরি আবাসন আইন পাসের উদ্যোগ নিলেও ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় তা পাস না হওয়ায় তিনি আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ছেঁড়েও একই দাবিতে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে আবাসনের দাম বেড়েছে প্রায় ১২৪ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
ইতালির মিলান শহরেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবারের সীমিত আয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে কিছু মুখোশধারী দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও বস্তু ছুড়ে মারে এবং ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এডি রামার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমানের অভিযোগে চলমান বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে তরুণ ও সাধারণ মানুষের এই আন্দোলন কেবল তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকট, আবাসন খাতে চরম অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত এই অসন্তোষ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।