বিশ্ববাজার থেকে বিপুল স্বর্ণ কিনছে চীন: নেপথ্যের কারণ কী?

প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ববাজার থেকে বিপুল স্বর্ণ কিনছে চীন: নেপথ্যের কারণ কী?

অনলাইন ডেস্ক: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতা কমানো এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো তাদের বিশাল বৈদেশিক সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রিজার্ভকে অধিকতর বহুমুখী ও স্থিতিশীল করা। পাশাপাশি, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের সঞ্চয়ের মান ও মূল্য ধরে রাখতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও দেদার স্বর্ণ কিনছেন।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ (পিবিওসি) জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসেও তারা বড় অংকের স্বর্ণ ক্রয় করেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা ২৩ মাস ধরে দেশের স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর ধারা অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এক মাসেই প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ কিনেছে চীন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর একমাসে এটিই ছিল দেশটির সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রয়ের ঘটনা।

এই ধারাবাহিক ক্রয়ের ফলে দেশটির মোট সরকারি রিজার্ভের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এখন স্বর্ণে রূপান্তর হয়েছে, যা ২০২৪ সালের শেষে ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে চীনের ঘোষিত স্বর্ণের মোট মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪১০ টনে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের স্বর্ণ কেনার পেছনে প্রধানত দুটি বড় কারণ কাজ করছে—প্রথমত, মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের (ট্রেজারিজ) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি এড়ানো।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশে থাকা প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম আলোড়ন তোলে এবং বিদেশে রাখা বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বেইজিং আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গুরুতর কোনো ভূরাজনৈতিক সংঘাত বাঁধলে চীনা সম্পদও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। ঘরের ভেতরে বা দেশের ভূখণ্ডে রক্ষিত স্বর্ণের ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয় না বিধায় এটি সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প।

এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ—যা ইতোমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—চীনের উদ্বেগ বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে এমন আশঙ্কায় ডলারভিত্তিক সম্পদের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে স্বর্ণকে ঢাল হিসেবে বেছে নিচ্ছে চীন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি সাধারণ চীনা নাগরিকদের মধ্যেও ব্যক্তিগতভাবে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে স্বর্ণের বার ও মুদ্রা ক্রয়ের হার আগের বছরের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর মূল কারণ হিসেবে দেশটির আবাসন খাত ও শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদী মন্দা এবং অনিশ্চয়তাকে দায়ী করা হচ্ছে। একসময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত আবাসন খাত বর্তমানে চরম সংকটে থাকায়, মূল্যস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের হাত থেকে বাঁচতে নাগরিকরা তাদের সঞ্চয় সোনায় বিনিয়োগ করছেন।

চীন বা অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনলেও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন না যে এর ফলে রাতারাতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে। ডলার এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ও লেনদেনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং বৈদেশিক রিজার্ভের ব্যবস্থাপনায় এক নতুন বৈশ্বিক ধারা তৈরি করতে পারে।