দাঙ্গার দায় ও শিক্ষা নিয়ে দ্বন্দ্বে বিভক্ত ফ্রান্স
অনলাইন ডেস্ক: ফ্রান্সে গত সপ্তাহের অন্তিমান্তে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন সহিংসতা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাটের ঘটনার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র বিভক্তি দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হঠাৎ কেন এমন রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক দাঙ্গায় রূপ নিল এবং এর আসল দায় কার—তা নিয়ে এখন চলছে বহুমুখী কাটাছেঁড়া। ফরাসি সমাজ ও রাজনীতিতে এই ঘটনা গভীর রেখাপাত করেছে।
শনিবারের ওই দাঙ্গার পর রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাটে কাচের টুকরা ও ভাঙা দোকানের সারি পড়ে থাকতে দেখা যায়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ন্যায্য আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে মাঠে নেমেছিল উগ্র বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী কিছু ছোট দল। ফরাসি পুলিশের দাবি, সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশি গাড়িতে হামলা ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, তিন হাজারের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চালানো লুটপাটের ঘটনাগুলোর বড় অংশই সুযোগসন্ধানীদের কাজ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক দোষারোপের খেলা। মাত্র ছয় মাস পর দেশটিতে জাতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনেজ এই সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সরাসরি দায়ী করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে ‘আগুনে ঘি ঢেলেছে’।
অন্যদিকে, বামপন্থী দল এলএফআইয়ের শীর্ষ নেতা এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সরকারের চরম অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, সরকার ইচ্ছে করেই পরিস্থিতি এমন জায়গায় যেতে দিয়েছে যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে দমনপীড়ন চালানো যায়।
সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন অভিবাসনবিরোধী উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বর্তমান ম্যাখোঁ সরকার ও বামপন্থীদের একহাত নিয়ে বলেন, ফ্রান্স আজ সহিংসতা ও অক্ষমতার জিম্মি দশায় পড়েছে। তিনি কঠোর হাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফেরানোর ডাক দিয়েছেন।
রাজনীতিকদের এই পারস্পরিক আক্রমণ ও ফায়দা লোটার প্রবণতায় চরম হতাশ সাধারণ ফরাসি নাগরিক ও শিক্ষকেরা। তাদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আকাশচুম্বী আবাসন সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো থেকে সবার নজর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না। শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তরুণদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের সামাজিক সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
সকালবেলা/ নুসরাত