ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলা রক্ষা করা দুই পাইলট কারা, কেন গোপনে তাঁদের পরিচয়

প্রকাশ: রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ণ
ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলা রক্ষা করা দুই পাইলট কারা, কেন গোপনে তাঁদের পরিচয়

অনলাইন ডেস্ক: ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজে ককপিটের ভেতরে সহকারী পাইলটের তাণ্ডব ও রক্তক্ষয়ী হামলায় গুরুতর আহত হন উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন। সহকারী পাইলটের তাণ্ডবে বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে নিচে নেমে আসতে থাকলে যাত্রীদের মধ্যে থাকা দুই ‘অতিরিক্ত পাইলট’ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে উড়োজাহাজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। তাঁদের দ্রুততা ও বীরত্বপূর্ণ তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত এক বড় ধরনের আকাশ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে অলৌকিক এই ঘটনার ৩ দিন অতিক্রান্ত হলেও ওই দুই উদ্ধারকারী পাইলটের পরিচয় এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান সংস্থা 'ফ্লাইদুবাই' নিশ্চিত করেছে ওই দুজন সেদিন ডিউটিরত অফিশিয়াল ক্রু হিসেবে নয়, বরং সাধারণ যাত্রী হিসেবে ফ্লাইটে অবস্থান করছিলেন। তবে উদ্ধারকারী দুই পাইলটের জীবনের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছুই জানায়নি আমিরাতের এই বিমান সংস্থাটি।

উড়োজাহাজটির দ্বিতীয় সারিতে বসে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী ড্যানিয়েল শ্লিখটার বার্তা সংস্থা এপি-কে জানান, উড়োজাহাজটিতে ওই দুই পাইলটের উপস্থিতি ছিল শতভাগ অলৌকিক ঘটনার মতো। মূলত তেল আবিব থেকে উড়োজাহাজটি পরবর্তীতে দুবাইয়ে ফিরিয়ে আনার কথা থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তাঁদের যাত্রীরবেশে সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। এভিয়েশন বা বিমান চলাচলের ভাষায় ডিউটি ছাড়া যাত্রী হিসেবে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার এ ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ডেডহেডিং’ (Deadheading)।

যাত্রী শ্লিখটারের দেওয়া রোমহর্ষক বর্ণনা অনুযায়ী, ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে মারামারি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় বাইরে থাকা সাধারণ যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন। সহকারী পাইলট অনবরত ধারালো অস্ত্র ও আঘাত দিয়ে ক্যাপ্টেনকে পরাস্ত করার চেষ্টা করছিলেন। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় মূল ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার শেষ চেষ্টা হিসেবে কোনোমতে ককপিটের ডিজিটাল নিরাপত্তা দরজা খুলতে সক্ষম হন। দরজা উন্মুক্ত হতেই যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে হামলাকারী সহকারী পাইলটকে কাবু করার চেষ্টা চালান।

ঠিক সেই মুহূর্তে যাত্রীবেশে থাকা দুই অতিরিক্ত পাইলটের একজন অতিদ্রুত যাত্রীদের জটলা ঠেলে সোজা ককপিটে ঢুকে পড়েন এবং উড়োজাহাজের রডার ও ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। কয়েক মুহূর্ত পর দ্বিতীয় পাইলটটিও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। ককপিট পুরোপুরি সুরক্ষিত করতে তাঁরা ভেতর থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজা বন্ধ করে দেন।

শ্লিখটার বলেন, "প্রথম যিনি ককপিটে ঢুকেছিলেন, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। সত্যি বলতে, তিনি সত্যিকারের একজন বীরের মতো আচরণ করেছেন। মাঝ আকাশে ধ্বংসের মুখে পড়া বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় তাঁর আত্মবিশ্বাস ও প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি পুরোপুরি তৈরি ছিলেন।"

সহকারী পাইলটের আকস্মিক হামলায় উড়োজাহাজটির সাম্য রক্ষা করতে ও স্থিতিশীল করতে বেশ কিছুটা কঠিন সময় পার করতে হয়। এ সময় জরুরি বিপৎসংকেত (Mayday) পাঠানো হয় মেডে হিসেবে। অবশেষে নতুন দায়িত্ব নেওয়া পাইলটরা মাইকে যাত্রীদের নিশ্চিত করেন যে, তাঁরা নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে যাচ্ছেন। ককপিটে হামলার ভয়াবহতার প্রায় ৪৫ মিনিট পর উড়োজাহাজটি সফল ও নিরাপদে সৌদি ভূমিতে স্পর্শ করে।

সংবাদ সংস্থা এপিকে শ্লিখটার আরও জানান, ঘটনার শুরুতে উড়োজাহাজের ভেতর অন্য দুই অতিরিক্ত পাইলটের প্রকৃত পরিচয় বা উদ্দেশ্য জানা না থাকায় তাঁরা মারাত্মক শঙ্কায় ছিলেন। এমনকি বিমানটি হাইজ্যাক করে অন্য কোথাও অপহরণ করা হচ্ছে কিনা তা নিয়েও তাঁদের মনে সংশয় জেগেছিল। তবে সৌদি আরবে জরুরি অবতরণের ঘোষণা দেওয়ার পরই যাত্রীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

এদিকে ককপিটে ক্যাপ্টেনকে হত্যাচেষ্টাকারী হামলাকারী সহকারী পাইলটের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলাদা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের গোপন সূত্রে তাঁর নাম হামাম আল-হাম্মামি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সংবাদ সূত্রগুলো দাবি করেছে, অভিযুক্ত সহকারী পাইলট ওমানের নাগরিক। তবে তাঁর সঠিক পরিচয়, ব্যক্তিগত তথ্য ও চরমপন্থী বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে কোনো প্রকার গোপন যোগসাজশ আছে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি ঘিরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি শনিবার জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা পুরো বিষয়টিকে একটি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন। বিমান সংস্থায় কোনো চরমপন্থী সেল রয়েছে কি না, হামলার আসল রহস্য কী এবং এর পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না— তা খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।