যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
অনলাইন ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত এখন আর কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সমান্তরালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে এক নতুন প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ইরান সংকট কি তবে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈশ্বিক বৈরিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি পরোক্ষ ফ্রন্টে পরিণত হচ্ছে?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'এশিয়া টাইমস'-এর এক বিস্তৃত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। তবে ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ওয়াশিংটনের যুদ্ধকৌশল এবং তেহরানকে পুরোপুরি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাকে অত্যন্ত জটিল ও কঠিন করে তুলছে।
ইরানের অর্থনীতিতে চীনই বড় ভরসা
সংকটময় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের ভেঙে পড়া অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে চীন। সংঘাত তীব্র হওয়ার আগেও চীন ছিল ইরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৩ থেকে ১৪ শতাংশই আসত ইরান থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব আরোপিত কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখে চীনা স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলোর (টিপটস) মাধ্যমে তেল বিক্রি করে ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সংগ্রহ করছে। এসব চীনা প্রতিষ্ঠান পশ্চিমা ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই বাণিজ্য রুখতে চীন-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ওয়াশিংটনের সামনে এখন বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে—ছোটখাটো ইরানি বা চীনা কোম্পানির ওপর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও, চীনের মূলধারার কোনো বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে তা মুহূর্তেই ইরান যুদ্ধকে সরাসরি 'যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যুদ্ধে' রূপ দেবে।
দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট সহায়তার অভিযোগ
বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, চীনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ইরানে এমন কিছু দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (ডিউয়াল-ইউজ) প্রযুক্তি ও মেকানিক্যাল খুচরা যন্ত্রাংশ পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে, যা সামরিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে। এমনকি সামরিক স্থাপনা তদারকিতে চীনের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহ করছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে মার্কিন গোয়েন্দারা। যদিও বেইজিং এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে।
হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির হিসাব
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর চীনের শিল্প খাতের বিশাল নির্ভরতা রয়েছে। ফলে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করতে স্ট্র্যাটেজিক 'হরমুজ প্রণালি' পুরোপুরি অবরুদ্ধ বা সামরিকীকরণের চেষ্টা করে, তবে সেটি চীনা অর্থনীতির জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। এজন্য চীন শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে আসছে এবং অঞ্চলে চরম অস্থিতিশীলতার বিরোধিতা করছে। বেইজিং চায় না তেহরানের পতন হোক, আবার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হোক—সেটিও তাদের কাম্য নয়।
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সমর্থনের সীমা
ইরানের প্রতি চীনের মিত্রতারও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। বেইজিং তেহরানের জন্য সরাসরি সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি। বরং তারা নিজেদের একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে তেহরানের ‘বৈধ অধিকার ও স্বার্থ’ রক্ষার সমর্থনে কথা বললেও, উভয় পক্ষকে সংযম বজায় রেখে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানান। তাছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অন্যান্য আরব দেশগুলোতে চীনের শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ থাকায় তারা ঢালাওভাবে ইরানের একক পক্ষে অবস্থান নিতে পারছে না।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন বৈশ্বিক ময়দান
সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, ইরান সংকটকে সরাসরি 'যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রত্যক্ষ যুদ্ধ' বলা না গেলেও, এটিকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ভাবার সুযোগ নেই। যেখানে ওয়াশিংটন তাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক বলপ্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রভাবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে; সেখানে চীন তাদের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা, জ্বালানি ক্রয়, প্রযুক্তি এবং কূটনৈতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে মার্কিন একক প্রভাবকে প্রতিরোধ করছে। এর ফলে ইরান সংঘাত শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এক নতুন মোড় এনে দিচ্ছে।